নিজস্ব প্রতিবেদক, টাঙ্গাইল: ১৮ বছর ধরে যে মানুষটিকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো আগলে রেখেছিলেন, যাঁর কোনো অন্যায়ের কথা কখনো কল্পনাও করেননি, সেই চেনা মানুষটির হাতেই প্রাণ হারাতে হলো টাঙ্গাইলের গৃহবধূ নাজমা আলমকে (৫১)। ঘাতক আর কেউ নন, স্থানীয় বিশ্বাস বেতকা চৌরাস্তা জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. মোশারফ হোসেন (৪২)। ঋণের বোঝা থেকে বাঁচতে দীর্ঘদিনের পারিবারিক সুসম্পর্ক আর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে দিনদুপুরে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটান তিনি। ইতোমধ্যে পুলিশ ঘাতক মুয়াজ্জিন মোশারফ ও লুণ্ঠিত সোনা ক্রেতা স্বর্ণ ব্যবসায়ী সন্তোষ কর্মকারকে গ্রেপ্তার করেছে। আদালতে হাজির করা হলে মোশারফ নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বিশ্বাস ও আতিথেয়তার আড়ালে ঘাতক
পুলিশি তদন্ত ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত নাজমা আলম টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাস বেতকা এলাকার ভেটেরিনারি চিকিৎসক শফিউল আলম শাহীনের স্ত্রী। প্রায় ১৮ বছর ধরে মোশারফ এই পরিবারটির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আসছিলেন। সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে, মোশারফের কাছে ওই বাসার এক সেট চাবি এবং সিসিটিভি ক্যামেরার পাসওয়ার্ড পর্যন্ত দেওয়া ছিল। গত ৩ বছর ধরে তিনি নিয়মিত এই বাসায় খাবার খেতেন এবং মাঝেমধ্যেই টাকা-পয়সা ধার নিতেন।
হত্যাকাণ্ডের দিন সকালে চিকিৎসক শফিউল আলম পেশাগত কাজে বাইরে গেলে নাজমা আলম বাসায় একা ছিলেন। চেনা মানুষ হিসেবে মোশারফ বাসায় ঢুকলে নাজমা আলম তাকে যথারীতি চা-বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করেন। কিন্তু এই আতিথেয়তার আড়ালে যে এক ভয়ংকর খুনি লুকিয়ে ছিল, তা তিনি টের পাননি।
হাতুড়ির আঘাত, অতঃপর নির্মম হত্যা
তদন্তে জানা যায়, মুয়াজ্জিন মোশারফ সম্প্রতি প্রায় ১৫ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সেই ঋণের চাপ থেকে বাঁচতে তিনি নাজমা আলমের কাছে ১ লাখ টাকা হাওয়ালাত বা ধার চান। কিন্তু নাজমা আলম তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ক্ষিপ্ত ও লোভাতুর হয়ে ওঠেন মোশারফ। চা খাওয়ার পর হাত ধোয়ার উসিলায় বেসিনের কাছে গিয়ে সেখান থেকে একটি হাতুড়ি এনে আচমকা নাজমা আলমের মাথায় সজোরে আঘাত করেন।
আঘাতের পর নাজমা আলম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে মোশারফ তার হাত থেকে দুটি স্বর্ণের বালা এবং লকেটসহ গলার চেইন খুলে নেন। পাশাপাশি খাটের নিচে থাকা নগদ ২৯ হাজার টাকাও লুটে নেন। একপর্যায়ে নাজমা আলম জ্ঞান ফিরে পেয়ে গোঙাতে শুরু করলে এবং বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে, অপরাধ ঢাকতে মোশারফ গামছা দিয়ে তার হাত বাঁধেন এবং গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর আলামত নষ্ট করতে তিনি বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করেন এবং ক্যামেরার ডিভিআর (DVR) মেশিন ও হাতুড়িটি সাথে করে নিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি পুকুরে ফেলে দেন।
হত্যার পর নিজেই চাইলেন বিচার!
এই ঘটনার সবচেয়ে চোখ কপাল তোলার মতো বিষয় ছিল হত্যাকাণ্ডের পর মোশারফের ঠান্ডা মাথার অভিনয়। গৃহকর্মী এসে লাশ উদ্ধারের পর যখন এলাকায় শোরগোল পড়ে যায়, তখন মোশারফও অন্য প্রতিবেশীদের সাথে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। শুধু তাই নয়, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং উপস্থিত গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে জোর গলায় এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও খুনিদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান! এরপর যথারীতি মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন এবং আজানও দেন।
যেভাবে ধরা পড়ল অপরাধী
হত্যাকাণ্ডের পর লুণ্ঠিত স্বর্ণালংকারগুলো মোশারফ স্থানীয় টাঙ্গাইল শহরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী সন্তোষ কর্মকারের কাছে বিক্রি করে দেন। ঘটনার তদন্তে নেমে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং স্থানীয় তথ্যের সূত্র ধরে প্রথমে স্বর্ণ ব্যবসায়ী সন্তোষকে আটক করে। সন্তোষের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সোমবার সন্ধ্যায় মুয়াজ্জিন মোশারফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মোশারফকে গ্রেপ্তারের পর তার কক্ষ থেকে নগদ ২৬ হাজার ৩২০ টাকা এবং হত্যাকাণ্ডের সময় পরিহিত রক্তমাখা পোশাক উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে টাঙ্গাইল সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.এস.এম. মাহবুব রেজওয়ান সিদ্দিকী এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক সবিস্তার তথ্য প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম মাহবুব খানের আদালতে হাজির করা হলে ঘাতক মোশারফ নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
দীর্ঘ ১৮ বছরের নুন-ভাতের সম্পর্ক আর বিশ্বাসের এমন নির্মম পরিণতি দেখে স্তম্ভিত পুরো টাঙ্গাইলবাসী।
