শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৬ জুলাই ২০২৬: বিশ্ব সাপ দিবসে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পৃথক দুটি লোকালয় থেকে দুটি অজগর সাপ সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) উপজেলার উত্তর ভাড়াউড়া এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নের হুগলিয়া এলাকায় সাপ দুটির কারণে তৈরি হওয়া তীব্র আতঙ্ক থেকে স্থানীয় জনগণকে মুক্ত করে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন উদ্ধার হওয়া দুটি অজগরই পৃথক দুটি স্থানে গাছের মগডালে ও বাঁশের একদম ওপরে আশ্রয় নিয়েছিল, যেখানে উদ্ধারকারীরা উঁচুতে উঠে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের মাধ্যমে সেগুলোকে নামিয়ে আনেন।
তবে এই জোড়া অভিযানের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক পরম মানবিক দায়িত্ববোধ ও শোককে শক্তিতে রূপান্তরের গল্প। মাত্র দুদিন আগে, ১৪ জুলাই সকালে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব শীতেশ রঞ্জন দেব পরলোকগমন করেন। সনাতন ধর্মের প্রথা অনুযায়ী পিতার মৃত্যুর পর অশৌচকালীন সাদা কাপড় (উত্তরী) পরিহিত অবস্থাতেই, গভীর শোক বুকে চেপে লোকালয়ের সাধারণ মানুষকে আতঙ্কমুক্ত করতে এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় মাঠে নেমে পড়েন তাঁর সুযোগ্য সন্তান ও ফাউন্ডেশনের বর্তমান পরিচালক স্বপন দেব সজল।
১. উত্তর ভাড়াউড়ায় প্রথম অজগর উদ্ধার ও আতঙ্ক নিরসন (সকাল ১১:৩০)
আজ সকাল আনুমানিক ১১:৩০ ঘটিকায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৫ নং পুল উত্তর ভাড়াউড়া এলাকার বাসিন্দা যোবায়ের আহমেদের বাড়ি থেকে প্রথম অজগরটি উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার বিবরণ: যোবায়ের আহমেদের বাসা থেকে বেশ কয়েকদিন ধরে হাঁস ও মুরগির বাচ্চা নিখোঁজ হচ্ছিল। আজ সকালে হঠাৎ তারা একটি অজগর সাপ বাড়ির দেয়ালের ওপর থেকে পাশের গাছের দিকে যেতে দেখেন। দেখতে দেখতে সাপটি গাছের মগডালে চড়ে বসে। তখনই পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন, এতদিন ধরে হারিয়ে যাওয়া হাঁস-মুরগিগুলো এই অজগরটিই খেয়ে আসছিল এবং পুরো বাড়ির লোকজনের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গাছের মগডাল থেকে উদ্ধার: তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে জানানো হলে, পিতার মৃত্যুর শোক বুকে নিয়ে গলায় সাদা কাপড় জড়ানো অবস্থায় ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল, পরিবেশ কর্মী রাজদীপ দেব দীপ ও রিদন গৌড় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সাপটি গাছের মগডালে থাকায় উদ্ধারকারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠে পড়েন এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সাপটিকে অক্ষত অবস্থায় গাছ থেকে নামিয়ে আনেন। এতে আতঙ্ক দূর হয় পরিবারটির। পরবর্তীতে সাপটিকে শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।
২. হুগলিয়ায় হাজারো মানুষের ভিড় ও বাঁশের ওপর থেকে দ্বিতীয় অজগর উদ্ধার (বিকেল ৬:০০)
একই দিন বিকেল ৬:০০ ঘটিকায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের হুগলিয়া এলাকায় আরেকটি অজগর সাপ উদ্ধার করা হয়।
উত্তেজনা ও জনসচেতনতা: হুগলিয়া এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা হঠাৎ বিশাল আকৃতির একটি সাপ দেখতে পেয়ে তীব্র আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাড়া খেয়ে সাপটি তরতরিয়ে একটি উঁচু বাঁশের ওপরে উঠে আশ্রয় নেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অনেকে সাপটিকে মারার চেষ্টা করলেও স্থানীয় কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি এগিয়ে আসেন। তারা সাপটিকে রক্ষা করার উদ্যোগ নেন এবং দ্রুত বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে খবর দেন। এদিকে সাপটি দেখতে মুহূর্তের মধ্যেই আশপাশের এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় জমান।
ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান: খবর পেয়ে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশ কর্মী রাজদীপ দেব দীপ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে উপস্থিত উৎসুক ও আতঙ্কিত জনতাকে শান্ত করে উদ্ধারকারীরা বাঁশের উঁচুতে উঠে পড়েন। সবার সহযোগিতায় অত্যন্ত নিরাপদে অজগর সাপটিকে নিচে নামিয়ে এনে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, যার ফলে স্বস্তি ফেরে পুরো এলাকায়।
পিতার মহৎ আদর্শ ও এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত
বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শীতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুর পর পরিবারের সবাই যখন শোকগ্রস্ত, ঠিক তখনই লোকালয়ে সাপের উপদ্বব আর মানুষের আতঙ্কের খবর পেয়ে ঘরে বসে থাকতে পারেননি ছেলে স্বপন দেব সজল। গায়ে অশৌচের সাদা কাপড় জড়িয়েই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাছে ও বাঁশের ওপরে উঠে তিনি বন্যপ্রাণী ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ছুটে গেছেন।
উপস্থিত স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশ কর্মীরা আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, মাত্র তিন দিনের মাথায় যার বাবা মারা গেছেন, তিনি নিজের এই কঠিন সময়েও একদিকে বন্যপ্রাণীর জীবন রক্ষা এবং অন্যদিকে জনগণকে আতঙ্কমুক্ত রাখতে যেভাবে বিপজ্জনকভাবে উঁচুতে উঠে আত্মনিয়োগ করেছেন—তা এক বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। পিতার রেখে যাওয়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মহান ব্রত ও জনসেবাকে তিনি পরম শ্রদ্ধায় ও কর্তব্যে আগলে রেখেছেন।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
