আমারসিলেট সম্পাদকীয় ডেস্ক: শ্রীমঙ্গল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন নগরী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে, নিরাপদ পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে এবং এই জনপদের আতিথেয়তার স্বাদ নিতে। তাই এই অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং সমগ্র শ্রীমঙ্গলের ভাবমূর্তি, পর্যটন অর্থনীতি এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সম্প্রতি একটি রিসোর্টকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও, বক্তব্য ও অভিযোগ নতুন করে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—তদন্তের আগেই সামাজিক মাধ্যমে বিচার শুরু হয়ে যাওয়া। খণ্ডিত ভিডিও, অসম্পূর্ণ তথ্য এবং একপাক্ষিক বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে জনমত গঠন কোনো সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এতে যেমন প্রকৃত অপরাধী আড়ালে থেকে যেতে পারে, তেমনি নির্দোষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়—যদি কোথাও পর্যটকদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রলুব্ধ করা, গোপনে ভিডিও ধারণ, ব্ল্যাকমেইল, অর্থ আদায় কিংবা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে—তবে তা শুধু দণ্ডবিধির বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং পর্যটন শিল্পের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি। আবার, অভিযোগের প্রতিকারে যদি কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, অনধিকার প্রবেশ করে, সমান্তরাল বিচার বা শক্তি প্রদর্শনের পথ বেছে নেয়, তবে সেটিও সমানভাবে আইনের শাসনের পরিপন্থী।
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—যার কাজ, তা কি তারাই করছে? নাকি আমরা এমন এক সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে তদন্ত করবে অন্য কেউ, বিচার করবে অন্য কেউ, আর শাস্তি দেবে আরেকটি পক্ষ? এই প্রবণতা চলতে থাকলে রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গভীরভাবে অনুসন্ধানের দাবি রাখে। কোনো রিসোর্ট বা আবাসিক প্রতিষ্ঠানে যদি অতিথিদের গতিবিধি গোপনে রেকর্ড করার উদ্দেশ্যে বিশেষ কর্মী নিয়োগের অভিযোগ থেকে থাকে, তবে সেই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া জরুরি। কোথায় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে স্বেচ্ছায় না অগোচরে, তার আইনগত ভিত্তি কী, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত, ধারণকৃত তথ্য কার হেফাজতে থাকে এবং তার অপব্যবহারের সুযোগ আছে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
এখন সময় এসেছে বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের। শ্রীমঙ্গলের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠন, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নাগরিক সমাজ এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সিসিটিভি ব্যবস্থাপনা, নৈতিক ব্যবসায়িক আচরণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বচ্ছ নীতিমালাও প্রণয়ন করা জরুরি।
একই সঙ্গে, প্রমাণিত ব্ল্যাকমেইল, গোপন ভিডিও ধারণ, চাঁদাবাজি, মানব পাচার, মাদক বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল, ভারী আর্থিক জরিমানা এবং ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি স্থায়ীভাবে বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা জনতার বিচারের সংস্কৃতিকেও সমান কঠোরতার সঙ্গে প্রতিহত করতে হবে।
শ্রীমঙ্গলের পরিচয় অপরাধের নয়; সৌন্দর্য, আতিথেয়তা এবং শান্তির। এই পরিচয় রক্ষা করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার নাগরিক দায়িত্ব। সত্য উদ্ঘাটন হোক নিরপেক্ষ তদন্তে, বিচার হোক আদালতে, আর শ্রীমঙ্গল হোক নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও বিশ্বস্ত পর্যটনের প্রতীক।
কারণ, আইনের শাসনের বিকল্প কখনোই সামাজিক উত্তেজনা বা খণ্ডিত প্রচারণা হতে পারে না।
