হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, ধামাচাপা দিতে সক্রিয় সিন্ডিকেট
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য গ্রহণ করা ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, ভুয়া বিল উত্তোলন, সরকারি মালামাল আত্মসাৎ এবং ঠিকাদার-প্রকৌশলী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ এবং তদন্তের বিষয় সামনে আসার পর তা ধামাচাপা দিতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ জুন শনিবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সিলেটে প্রকল্প কার্যালয়ে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা, প্রকৌশলী এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে প্রকল্পের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মোকাবিলা, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের প্রভাব কমানো এবং তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকল্পের অনিয়ম, ভুয়া বিল উত্তোলন এবং সরকারি মালামাল গায়েব হওয়ার অভিযোগ নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। এরপরই একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের আওতায় ব্যবহারের জন্য বরাদ্দকৃত বিপুল পরিমাণ তামার তার, ক্যাবল, ট্রান্সফরমার, লোহার খুঁটি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জামের বড় অংশের কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় কাজ অসম্পূর্ণ থাকলেও অনেক মালামাল গুদাম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি কিছু মালামাল বিক্রি ও পাচারের অভিযোগও উঠেছে।
সূত্রের দাবি, সম্প্রতি টাঙ্গাইলের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সিলেটে এসে একাধিক বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে অভিযোগ মোকাবিলা এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে প্রায় ২০০ কোটি টাকার নতুন একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি খুবই সীমিত। ছাতক বিউবো গ্রিড থেকে গোবিন্দগঞ্জ ট্রাফিক পয়েন্ট হয়ে রাউলী সাবস্টেশন পর্যন্ত ৩৩ কেভি লাইনের কাজ ২০১৮ সালে শুরু হলেও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। প্রায় ৩ হাজার ৬০০টি খুঁটি স্থাপনের কথা থাকলেও বাস্তবে বসানো হয়েছে মাত্র কয়েকশ’ খুঁটি।
এছাড়া নতুন বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন, পুরোনো লাইন সংস্কার এবং সাবস্টেশন উন্নয়নের নামে একাধিকবার বিল উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একই কাজের জন্য প্রকল্প অফিস এবং বিভাগীয় দপ্তর—উভয় জায়গা থেকেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
জানা গেছে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালে “বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ” অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। তবে শুরু থেকেই ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা ও উচ্চমূল্য নির্ধারণ নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে প্রশ্ন ওঠে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার নতুন বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, ৩ হাজার কিলোমিটার পুরোনো লাইন সংস্কার, ২২টি জিআইএস সাবস্টেশন স্থাপন ও সংস্কার, ১৭টি গ্রিড সাবস্টেশন সম্প্রসারণ এবং ৩ হাজার ৪৮৫টি বিতরণ স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে মাঠপর্যায়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নতুন সংযোগ, লাইন সম্প্রসারণ ও ট্রান্সফরমার স্থাপনের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম, ভুয়া বিল উত্তোলন ও সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুদক ইতোমধ্যে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া বলেন, “সব সিদ্ধান্ত ও অনুমোদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির ব্যস্ততার কারণে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) চন্দন কুমার সূত্রধরের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব আর্থিক লেনদেন, মালামাল ক্রয়-বিক্রয়, বিল উত্তোলন ও কাজের বাস্তব অগ্রগতি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সঠিক তদন্ত হলে বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্রও উন্মোচিত হবে।
তারা মনে করেন, দুদকের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সরকারি অর্থের অপচয় রোধের পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
