মুহাম্মদ আনিছুল ইসলাম আশরাফী: ১০ মহররমের আশুরা ইসলামের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন। তবে অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষকের মতে, ১১ মহররম ছিল কারবালার ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সূচনা। কারণ যুদ্ধ শেষ হলেও শেষ হয়নি অত্যাচার; বরং শুরু হয়েছিল শহীদদের পরিবার—রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় আহলে বাইতের নারী, শিশু ও অসুস্থ একমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্যের বন্দিজীবনের মর্মন্তুদ যাত্রা।
কারবালার প্রান্তরে ১০ মহররমে ইমাম হুসাইন رضي الله تعالى عنه ও তাঁর বিশ্বস্ত সাথীরা শহীদ হওয়ার পর ১১ মহররমে উমর ইবনে সাদের বাহিনী নিজেদের নিহতদের দাফন করে। অন্যদিকে বহু ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, ইমাম হুসাইন رضي الله تعالى عنه, তাঁর ভাই, ভাতিজা, সন্তান এবং সাথীদের পবিত্র দেহ কিছু সময় কারবালার উত্তপ্ত বালুচরে দাফনহীন অবস্থায় পড়ে ছিল। পরবর্তীতে বনি আসাদের লোকজন ইমাম জয়নুল আবেদীন رضي الله تعالى عنه-এর সহায়তায় তাঁদের দাফন করেন।
ভাবুন, একটি পরিবারের প্রায় সব সক্ষম পুরুষ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। পিতা নেই, ভাই নেই, সন্তান নেই, স্বজন নেই। চারদিকে ছড়িয়ে আছে রক্তাক্ত নিথর দেহ। সেই পরিবারের নারী ও শিশুদের শোক প্রকাশেরও সুযোগ দেওয়া হলো না। বরং বন্দি করে উটের পিঠে তুলে কুফার পথে নিয়ে যাওয়া হলো। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই এটি এমন এক ট্র্যাজেডি, যার গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
ইতিহাসে বর্ণিত আছে, আহলে বাইতের বন্দিদের শহীদদের দেহের পাশ দিয়েই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অনেক শিয়া ঐতিহ্য ও মাকতাল গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, হযরত জয়নাব رضي الله تعالى عنها ভাইয়ের শাহাদাতস্থলের কাছে এসে গভীর বেদনায় আল্লাহর দরবারে বলেন, “হে আল্লাহ! আমাদের পক্ষ থেকে এই কোরবানি কবুল করুন।” এই বর্ণনার সনদ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে ধৈর্য ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে।
ইমাম জয়নুল আবেদীন رضي الله تعالى عنه-এর বয়স তখন প্রায় ২২ বছর। তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় বেঁচে থাকা একমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্য। বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, কারবালার মাটিতে স্বজনদের রক্তাক্ত দেহ দেখে তাঁর হৃদয় ভেঙে যাচ্ছিল। তখন হযরত জয়নাব رضي الله تعالى عنها তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ভাষায় বলেন, এমন এক সময় আসবে যখন মানুষ এই শহীদদের কবরকে সম্মান করবে এবং তাদের স্মৃতি কখনো বিলীন হবে না। আজ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কারবালা কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অম্লান।
কিছু বর্ণনায় আরও এসেছে, ১১ মহররমের রাতে ইমাম হুসাইন رضي الله تعالى عنه-এর পবিত্র মস্তক খউলির ঘরে রাখা হয়েছিল এবং অলৌকিক নূরে ঘর আলোকিত হয়ে উঠেছিল। আবার কিছু সূত্রে ইমাম জয়নুল আবেদীন رضي الله تعالى عنه-এর হৃদয়বিদারক উক্তিও উদ্ধৃত হয়েছে—তিনি নাকি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “বাবা! আমার হাত যদি বাঁধা না থাকত, তবে আপনাকে এভাবে খোলা আকাশের নিচে রেখে যেতাম না।” এসব বর্ণনা মূলত পরবর্তী মাকতাল সাহিত্যে পাওয়া যায়; ইতিহাসবিদদের মধ্যে এগুলোর সনদ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এসব বর্ণনার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেই অসহনীয় বেদনার চিত্র ফুটিয়ে তোলা।
কুফায় পৌঁছে বন্দি আহলে বাইতকে জনসমক্ষে আনা হয়। এরপর তাদের দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে নেওয়া হয়। ইতিহাসে নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষিত রয়েছে হযরত জয়নাব رضي الله تعالى عنها-এর সেই সাহসী ভাষণ, যেখানে তিনি ইয়াজিদের ক্ষমতার অহংকারকে চ্যালেঞ্জ করে স্মরণ করিয়ে দেন—পার্থিব ক্ষমতা আল্লাহর পরীক্ষার অংশ; এটি চূড়ান্ত বিজয়ের প্রমাণ নয়। তিনি কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, আল্লাহ অবকাশ দেন, কিন্তু জালিমকে ছেড়ে দেন না।
লোকমুখে ও কিছু পরবর্তী বর্ণনায় আরও একটি ঘটনা প্রচলিত রয়েছে। সেখানে বলা হয়, ইয়াজিদ দম্ভভরে কুরআনের “তুমি যাকে ইচ্ছা সম্মান দাও এবং যাকে ইচ্ছা অপমান কর”—এই অর্থবোধক আয়াতের অংশ পাঠ করে নিজেকে বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল। তখন হযরত জয়নাব رضي الله تعالى عنها দৃঢ়তার সঙ্গে তাকে জবাব দেন। আরও কথিত আছে, একপর্যায়ে তিনি “থাম” বললে চারপাশের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায় এবং তিনি ইয়াজিদকে স্মরণ করিয়ে দেন যে প্রকৃত ক্ষমতা কেবল আল্লাহর; কোনো শাসকের নয়। এই ঘটনাটি জনপ্রিয় ধর্মীয় বর্ণনায় প্রচলিত হলেও প্রাচীন নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে একইভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই একে ঐতিহাসিক সত্যের পরিবর্তে প্রচলিত বর্ণনা হিসেবে দেখা অধিক সতর্কতাপূর্ণ।
কারবালার শিক্ষা কেবল একটি যুদ্ধের ইতিহাস নয়; এটি জুলুমের বিরুদ্ধে সত্যের অবস্থান, ধৈর্যের সর্বোচ্চ উদাহরণ এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য অধ্যায়। যদি কারবালার পর বন্দি নারী ও শিশুদের অবস্থার কথা কল্পনা করা হয়, তবে কোনো অতিরঞ্জনের প্রয়োজন হয় না। একটি পরিবার, যারা একই দিনে পিতা, ভাই, সন্তান, স্বজন—সব হারিয়েছে; তারপরও আল্লাহর ওপর আস্থা হারায়নি—এ দৃশ্য নিজেই মানব ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক অধ্যায়।
১১ মহররম আমাদের শুধু শোকের কথা স্মরণ করায় না; এটি মনে করিয়ে দেয় যে ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য, ধৈর্য এবং ন্যায়বিচারের আদর্শ চিরস্থায়ী। কারবালার শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে বন্দি কাফেলা কুফা ও দামেস্কে প্রবেশ করেছিল, ইতিহাসের বিচারে শেষ পর্যন্ত তারাই বিজয়ী হয়েছে। কারণ আজও মানুষ ইয়াজিদের ক্ষমতাকে নয়, ইমাম হুসাইন رضي الله تعالى عنه-এর আত্মত্যাগ, হযরত জয়নাব رضي الله تعالى عنها-এর সাহস এবং আহলে বাইতের ধৈর্যকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
তথ্যসূত্র (নির্বাচিত): আল-ইরশাদ, কামিলুজ জিয়ারাত, তারিখ তাবারী, আল-লুহুফ, নাফাসুল মাহমুম, আলামুল ওয়ারা, মাকতাল সাহিত্য এবং কারবালা বিষয়ক বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণা।
লেখক ও সাংবাদিক
মুহাম্মদ আনিছুল ইসলাম আশরাফী।
