মুহাম্মদ আনিছুল ইসলাম আশরাফী
মহররম মাস এলেই মুসলিম সমাজে দুটি বিপরীতমুখী চরম প্রবণতা চোখে পড়ে। একদল কারবালাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন ইসলামের ইতিহাস কেবল ১০ মহররম ৬১ হিজরী থেকেই শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, আরেকটি দল কারবালার আলোচনা এলেই নানা আপত্তি, ফতোয়া ও বিতর্কের দেয়াল তুলে দেন; যেন কারবালার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলাই এক চরম বাড়াবাড়ি। এই দুই বৈপরীত্যের বেড়াজালে একটি মৌলিক প্রশ্ন হারিয়ে যায়—কারবালা আসলে কী? এটি কি কেবল একটি সাময়িক যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাত, নাকি ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন সংঘর্ষের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়ের ধারাবাহিকতা?
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রথম মানব ও নবী আদম ﴿عليه السلام﴾-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে জান্নাতি পয়গম তাওহীদের যে অবিনশ্বর দাওয়াতের সূচনা হয়েছিল, তা-ই যুগে যুগে নূহ ﴿عليه السلام﴾, ইবরাহিম ﴿عليه السلام﴾, মূসা ﴿عليه السلام﴾ এবং ঈসা ﴿عليه السلام﴾-এর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ ﴿صلى الله عليه وسلم﴾-এর মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করেছে। কারবালার অনন্যতা ও গুরুত্ব এখানেই যে, এটি আশুরার প্রাচীন ইতিহাসকে এক নতুন ও শাশ্বত অর্থ দান করেছে। আদম থেকে শুরু হওয়া তাওহীদের সংগ্রাম, নূহের ধৈর্য, ইবরাহিমের আত্মত্যাগ এবং মূসার জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থানের মহান মূল্যবোধগুলোই যেন কারবালার প্রান্তরে এসে একত্রে জীবন্ত রূপ ধারণ করেছে। ইমাম হুসাইন ﴿رضي الله عنه﴾ কোনো পার্থিব ক্ষমতা বা সিংহাসনের জন্য নিজের জীবন দেননি; বরং তিনি দাঁড়িয়েছিলেন দ্বীনের মূল চেতনা ও সত্যকে সমুন্নত রাখতে। তাঁর এই মহিমান্বিত শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসে একটি স্থায়ী নৈতিক মানদণ্ড এঁকে দিয়েছে—সত্যের সঙ্গে আপস করে জিল্লতির জীবন বেছে নেওয়ার চেয়ে, সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করা অনেক বেশি গৌরবের।
দুঃখজনকভাবে, বর্তমান যুগে কারবালাকে ঘিরে এক বিরাট বিচ্যুতি ও শূন্যতা লক্ষ্য করা যায়। আমাদের মূলধারার খতিব সমাজ এবং গণমাধ্যম অনেক সময় বিতর্ক এড়ানো বা শিয়াদের সংস্কৃতির সাথে গুলিয়ে ফেলার এক অমূলক ভয়ে কারবালার মূল রাজনৈতিক ও বৈপ্লবিক চেতনা নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকে। এই যে একটি দীর্ঘ ‘ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শূন্যতা’ সমাজে তৈরি হয়, তার ফলে একদল মানুষ নিজেদের মতো করে কিছু আবেগীয় আচার-অনুষ্ঠান ও নতুন নতুন সৃষ্টির দেয়াল তৈরি করে সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। ফলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সৃষ্টি হয়—যেসব সমাজ বা এলাকায় কারবালার কোনো অনুষ্ঠান হয় না, সেখানকার সাধারণ মানুষ এই মহান ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থেকে যায়; আর যেখানে অনুষ্ঠান হয়, সেখানে হয়তো মানুষের ঘুম ভাঙে, কিন্তু তারা এক অতিরঞ্জিত ও মনগড়া ইতিহাসের চাদর গায়ে দিয়ে জেগে ওঠে।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগের একটি স্মৃতি আমার মানসপটে গভীরভাবে রেখাপাত করে। তখন আমি ছাত্র। পার্শ্ববর্তী জেলার এক প্রাজ্ঞ সুন্নি স্কলারকে প্রশ্ন করেছিলাম—কারবালার নামে যারা শরীয়ত পরিপন্থী বা ভুল কাজ করছে, ইসলামের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে বা জাতীয়-আন্তর্জাতিক সংকটে কেন তাদেরকে এবং তাদের আবেগকেই সবার আগে ময়দানে জীবন বাজি রেখে লড়তে দেখা যায়? তিনি আমাকে একটি লাইনে মানব মনস্তত্ত্বের এক গভীরতম রহস্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ভালোবাসা সব আইন মানে না।”
আজ দীর্ঘ কর্মজীবন ও সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় দাঁড়িয়ে সেই প্রাজ্ঞ শিক্ষকের কথাটির গভীরতা আমি উপলব্ধি করতে পারি। শরীয়তের বাহ্যিক আইন চলে খাতা-কলমে, যা মানুষকে অনুগত করতে পারে, কিন্তু বিপ্লবী করতে পারে না। অন্যদিকে, মানুষের ভেতরের তীব্র আবেগ বা ‘ইশক’ কোনো গণ্ডি বা ব্যাকরণ মেনে চলে না। রাসুলুল্লাহ ﴿صلى الله عليه وسلم﴾-এর পবিত্র আহলে বাইত এবং ইমাম হুসাইন ﴿رضي الله عنه﴾-এর প্রতি যে অবিনশ্বর ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত থাকে, তা বাহ্যিক প্রকাশের ক্ষেত্রে হয়তো কখনো কখনো পদ্ধতিগত ভুল বা অতিরঞ্জনের শিকার হয়; কিন্তু সেই একই ভালোবাসার তীব্র আগুনে যখন ইসলামের বড় কোনো সংকট সামনে আসে, তখন তারা পরিণতির হিসাব না করেই ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই নির্মম সত্যটি বারবার প্রতীয়মান হয়। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ মজলুম মানুষের অধিকার রক্ষা কিংবা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ময়দানে যারা জীবন বাজি রেখে সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তাদের বড় অংশই সেই হুসাইনী আদেশিক বলয়ের, যাদেরকে সমাজ অনেক সময় ফতোয়া দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখে। অন্যদিকে, যারা ইসলামকে কেবল কিছু shuṣka ফতোয়া, বাহ্যিক লেবাস আর আরামদায়ক তাত্ত্বিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে, বিপদের সময় তারা হকের পক্ষে দাঁড়ানোর চেয়ে নিজেদের সুরক্ষার জন্য ফতোয়ার ঢাল ব্যবহার করাকে বেশি নিরাপদ মনে করে।
তাই কারবালার প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে আমাদের এই দুই চরমপন্থা পরিহার করতে হবে। অতিরঞ্জনকে বর্জন করার অর্থ এই নয় যে আমরা ইসলামের এই মহত্তম ইতিহাসকে ভুলে যাব। বর্জন নয়, বরং সংস্কারই একমাত্র পথ। কারবালাকে দেখতে হবে ইসলামের সামগ্রিক ও দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন গল্প বা নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের আবেগের বিষয় নয়; বরং এটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐতিহাসিক ও নৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ। আজ যখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষমতাকে ন্যায়ের উপরে স্থান দেওয়া হয়, তখন কারবালা আমাদের বর্তমানের জন্য এক তীব্র সতর্কবার্তা এবং ভবিষ্যতের জন্য এক দেদীপ্যমান পথনির্দেশ হিসেবে আলো ছড়ায়।
