আতঙ্কে বাউসা-কেশবপুরের হাজারো মানুষ, স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধের দাবি
আনোয়ার হোসেন রনি, ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাউসা-কেশবপুর গ্রামে সুরমা নদীর ভয়াবহ ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ইতোমধ্যে শতবর্ষী পূর্ব বাউসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এবং বাউসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ায় আতঙ্কে দিন কাটছে হাজারো মানুষের।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি শুধু নদীভাঙন নয়, একটি জনপদের অস্তিত্ব সংকট। বর্ষা মৌসুমে সুরমা নদীর প্রবল স্রোত ও ঢেউয়ের আঘাতে নদীতীরের মাটি ধসে পড়ছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এ ভাঙনে বাউসা ও কেশবপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হলেও এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, যে স্থানে আজ নদীর উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে, কয়েক বছর আগেও সেখানে ছিল সবুজ ধানের ক্ষেত, ফলের বাগান, শিশুদের খেলার মাঠ, বসতঘর এবং গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। এখন সেখানে শুধু নদীর উত্তাল স্রোত।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, একসময় নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করে স্বচ্ছলভাবে জীবনযাপন করলেও নদীভাঙনে সব হারিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কেউ দিনমজুরি, কেউ রিকশা চালিয়ে, আবার কেউ শহরে শ্রম বিক্রি করে পরিবার চালাচ্ছেন। পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা ও ধর্মীয় জীবন। শতবর্ষের ইতিহাস বহনকারী পূর্ব বাউসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে বাউসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হারিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।
এদিকে নদীতীরবর্তী সড়কের বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের চলাচলও চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিও নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।
এলাকাবাসীর দাবি, আর আশ্বাস নয়—সুরমা নদীর তীর রক্ষায় দ্রুত টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ, নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ভাঙনকবলিত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও জনবসতি রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহি উদ্দিন নদীভাঙনের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “সুরমা নদীর ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের মতে, নদীভাঙন শুধু জমি বা স্থাপনা ধ্বংস করছে না; এটি এলাকার শিক্ষা, কৃষি, অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রতিদিন নতুন করে ভাঙনের শব্দ শুনে আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন নদীতীরের মানুষ।
বাউসা-কেশবপুরবাসীর একটাই দাবি—দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যথায় প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ষার স্রোতে হারিয়ে যাবে নতুন নতুন বসতি, আর মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাবে একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ।
