ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : ভালো বেতনে কাজ দেওয়ার কথা বলে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার তিন যুবককে ভারতে নেওয়ার পর তাঁদের আর কোনো সন্ধান পাচ্ছে না পরিবার। ভারতে পৌঁছানোর পর প্রথমদিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও কিছুদিন পর হঠাৎ তা বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে তাঁদের মুক্তির কথা বলে দফায় দফায় টাকা দাবি এবং টাকা না দিলে ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নিখোঁজ এক যুবকের মা।
ঘটনাটি নিয়ে ছাতক থানায় লিখিত অভিযোগের পর সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসেও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। পরিবারের দাবি, তিন যুবককে কোথায় রাখা হয়েছে বা তাঁরা বর্তমানে কী অবস্থায় আছেন—এ বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন। তাঁদের দ্রুত অবস্থান শনাক্ত করে উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
নিখোঁজ তিন যুবক হলেন—ছাতক উপজেলার সৈদেরগাঁও গ্রামের মৃত মনোহর আলীর ছেলে সোহেল মিয়া, একই গ্রামের মৃত রুসমত আলীর ছেলে আয়াছ আলী এবং জালিয়ারপাড় গ্রামের আনছার আলীর ছেলে আলা উদ্দিন। তাঁরা সবাই দিনমজুর হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
নিখোঁজ সোহেল মিয়ার মা মোছা. সামতেরা বেগমের অভিযোগ, একই গ্রামের বাসিন্দা ফারুক মিয়া ও তাঁর ছেলে ফাহিম পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে সোহেলসহ তিন যুবককে ভারতের কাশ্মীরে ভালো বেতনে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তাঁদের কথায় বিশ্বাস করে গত ২৮ জুলাই তিন যুবক বাড়ি থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন।
সামতেরা বেগম বলেন, ভারতে পৌঁছানোর পর প্রথমদিকে তিন যুবক পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। ফোনে তাঁরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু কিছুদিন পর হঠাৎ তাঁদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই তিন পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দেয়।
সামতেরা বেগমের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পর ফারুক মিয়া ও তাঁর ছেলে ফাহিমের পক্ষ থেকে স্বজনদের জানানো হয় যে, তিন যুবক ভারতে কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের মুক্তির জন্য প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে স্বজনরা ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার পরও আরও ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, একপর্যায়ে তিন যুবকের মুক্তির জন্য ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁদের হত্যা বা ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সামতেরা বেগম।
তিনি বলেন, “আমার ছেলেসহ তিনজনকে কোথায় রাখা হয়েছে, কী অবস্থায় আছে—আমরা কিছুই জানি না। তাঁদের আটকে রেখে টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে আমাদের আশঙ্কা। আমরা প্রশাসনের কাছে তাঁদের দ্রুত উদ্ধার করে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।”
সামতেরা বেগম জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে সহযোগিতা চেয়েছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলনের সঙ্গেও দেখা করে তিন যুবককে উদ্ধারে সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
এ ঘটনায় গত মাসের শেষ দিকে ছাতক থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়। পরে গত ৭ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসেও লিখিত অভিযোগ দেন সামতেরা বেগম।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ফারুক মিয়া বলেন, তাঁর ছেলে ফাহিম বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। তবে তিনিও বর্তমানে ফাহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না বলে দাবি করেন। তিন যুবকের সঙ্গে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না বলেও জানান।
ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) ঝলক মোহন্ত বলেন, তিন যুবককে কাজের উদ্দেশ্যে ভারতে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে আটকে রেখে টাকা দাবি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে তিন যুবকের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করে দ্রুত উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা কীভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন, বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে এবং টাকা দাবির অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠছে—ভালো চাকরির প্রলোভনে বিদেশে নেওয়ার পর তিন যুবকের সঙ্গে কী ঘটেছে? তাঁরা কি সত্যিই ভারতে আটক রয়েছেন, নাকি তাঁদের অন্য কোথাও রাখা হয়েছে? পরিবারের কাছে দাবি করা অর্থের প্রকৃত কারণই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তেই খুঁজে বের করতে হবে।
