হাজারো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায়, এলাকায় শোকের ছায়া
আনোয়ার হোসেন রনি, ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: একজন মানুষের চলে যাওয়া কখনো কখনো শুধু একটি পরিবারে শূন্যতা তৈরি করে না, শূন্য করে দেয় একটি সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের ভূইগাঁও গ্রামের বিশিষ্ট সালিশ ব্যক্তিত্ব সামছুল ইসলামের মৃত্যুতে তেমনই এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের সামাজিক অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা এবং মানুষের বিরোধ মীমাংসায় ন্যায়সংগত ভূমিকার কারণে তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন প্রবীণ এই সালিশ ব্যক্তিত্ব। তাঁর মৃত্যুর খবরে ভূইগাঁও গ্রামসহ ছাতক ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণগ্রাহীদের অনেকেই আপনজনের মতো একজন মানুষকে হারানোর বেদনায় শোকাহত হয়ে পড়েন।
মরহুম সামছুল ইসলাম ছিলেন ভূইগাঁও গ্রামের মরহুম রফাত উল্লাহর সন্তান। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক সম্প্রীতি এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছিল একজন অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও গ্রহণযোগ্য সালিশ ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তির সালিশে সামছুল ইসলামের উপস্থিতি ছিল আস্থার প্রতীক। জটিল বিরোধে ধৈর্য ধরে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা, বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা এবং ন্যায়সংগত সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অনেক বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ানোর আগেই তাঁর মধ্যস্থতায় সামাজিকভাবে মীমাংসা হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
সালিশের আসরে তিনি শুধু বিরোধ নিষ্পত্তির দিকেই গুরুত্ব দিতেন না; বরং বিরোধের কারণে যেন পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট না হয়, সেদিকেও নজর রাখতেন। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার বিষয়ে তিনি সবসময় গুরুত্ব দিতেন। এ কারণে অনেকের কাছে তিনি ছিলেন পরামর্শের মানুষ, সংকটে ভরসার মানুষ এবং সামাজিক অস্থিরতায় শান্তির পথ দেখানো একজন অভিভাবক।
তাঁর মৃত্যুতে তাই শুধু একজন সালিশ ব্যক্তিত্বকেই হারানোর বেদনা নয়, স্থানীয়দের মধ্যে একজন প্রবীণ সামাজিক অভিভাবককে হারানোর কষ্টও তৈরি হয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞ কণ্ঠ, বিচক্ষণ পরামর্শ ও সামাজিক ভূমিকা এখন এলাকাবাসীর কাছে স্মৃতি হয়ে থাকবে।
মৃত্যুকালে তিনি চার কন্যা ও এক পুত্র সন্তানসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
রোববার রাত সাড়ে ৯টায় ভূইগাঁও মাদ্রাসা মাঠে মরহুম সামছুল ইসলামের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাজারো মানুষ অংশ নেন। জানাজায় উপস্থিত অনেকের চোখে ছিল অশ্রু। প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায় জানাতে দূর-দূরান্ত থেকেও ছুটে আসেন তাঁর স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণগ্রাহীরা।
জানাজা শেষে রাত ১১টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে মরহুম সামছুল ইসলামকে দাফন করা হয়।
সামছুল ইসলামের চলে যাওয়া যেন নীরবে স্মরণ করিয়ে দিল—মানুষ চলে যায়, কিন্তু মানুষের জন্য করা ভালো কাজ, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতি এবং সমাজে রেখে যাওয়া ভালোবাসা থেকে যায়। সেই ভালোবাসা ও স্মৃতির মধ্যেই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন ছাতকের এই প্রবীণ সালিশ ব্যক্তিত্ব।
মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এলাকাবাসী, আত্মীয়স্বজন ও তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহী।
