কূটনৈতিক বাস্তবতা, ডলারনির্ভর বিশ্বব্যবস্থা, সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের করণীয়
ভারত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার; তবে BRICS-এ বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণে বহুপাক্ষিক কূটনীতিই হওয়া উচিত মূল কৌশল।
বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো মূলত পশ্চিমা শক্তিকেন্দ্রিক ছিল, এখন সেখানে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো নিজেদের জন্য অধিকতর ভূমিকা ও প্রতিনিধিত্ব দাবি করছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে BRICS।
২০০৯ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে যাত্রা শুরু করা BRIC পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকার যোগদানের মাধ্যমে BRICS-এ পরিণত হয়। এরপর সম্প্রসারণের ধারায় মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ইন্দোনেশিয়া যুক্ত হওয়ায় ২০২৬ সালে পূর্ণ সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১টি। একই সময়ে বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম—এই ১০টি দেশ Partner Country হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
২০২৬: নয়াদিল্লিতে BRICS-এর নতুন অধ্যায়
ভারতের সভাপতিত্বে ২০২৬ সালের ১২–১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন। ভারতের ২০২৬ সালের BRICS Chairship-এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল—
“Building for Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability”—অর্থাৎ সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করা।
সম্মেলনে New Delhi BRICS Leaders’ Declaration গৃহীত হয়েছে। ঘোষণায় বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, আর্থিক সংযোগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে BRICS-এর ভবিষ্যৎ সহযোগিতার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এবারের সম্মেলনে Partner Country-গুলোর অংশগ্রহণও গুরুত্ব পেয়েছে। BRICS নেতারা অভিন্ন স্বার্থের বিভিন্ন ক্ষেত্রে Partner Country-গুলোর আরও বিস্তৃত অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করেছেন।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ বর্তমানে BRICS-এর পূর্ণ সদস্য বা Partner Country নয়। ফলে ২০২৬ সালের সম্প্রসারিত কাঠামোর সামনে দাঁড়িয়ে ঢাকার জন্য নতুন করে কূটনৈতিক কৌশল নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের BRICS-আগ্রহ: ২০২৩ থেকে নতুন বাস্তবতা
বাংলাদেশ ২০২৩ সালে BRICS-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগ্রহ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রকাশ করেছিল। সে সময় বাংলাদেশের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যায়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ BRICS-এর পূর্ণ সদস্য বা Partner Country হিসেবে যুক্ত হয়নি।
তাই এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু “বাংলাদেশ BRICS-এর সদস্য হবে কি না”—এটি নয়; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, BRICS-এর সঙ্গে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারে।
ডলারনির্ভর বিশ্বব্যবস্থা ও BRICS-এর প্রয়োজনীয়তা
BRICS-এর গুরুত্ব বুঝতে হলে বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার একটি মৌলিক বাস্তবতা বুঝতে হবে—মার্কিন ডলারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আন্তর্জাতিক ঋণ, পেমেন্টব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেনে ডলার দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও অর্থনৈতিক নীতির আন্তর্জাতিক প্রভাবও ব্যাপক।
ডলারের এই কেন্দ্রীয় অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রভাব প্রয়োগের সক্ষমতা দেয়। নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক লেনদেনে বিধিনিষেধ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, শুল্ক বৃদ্ধি কিংবা বাণিজ্যিক চাপ—এসব পদক্ষেপের প্রভাব আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে বিষয়টি “ডলার মানেই যুদ্ধ”—এভাবে দেখলে বাস্তবতা অতিরঞ্জিত হবে। আবার এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে আন্তর্জাতিক আর্থিক অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হতে পারে।
বিশেষ করে কোনো দেশ যদি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থপ্রবাহে একটি নির্দিষ্ট মুদ্রা এবং সীমিত কিছু আর্থিক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তাহলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এখানেই BRICS-এর প্রয়োজনীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে।
BRICS-এর লক্ষ্যকে শুধু “ডলারবিরোধিতা” হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ হবে। বরং এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় বিকল্প পেমেন্টব্যবস্থা, স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার এবং অধিকতর বহুমুখী আর্থিক সংযোগ তৈরি করা।
২০২৬ সালের BRICS আলোচনায়ও একটি অভিন্ন BRICS মুদ্রা চালুর চেয়ে সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো এবং আন্তঃসীমান্ত পেমেন্টব্যবস্থার সংযোগ উন্নত করার ওপর বেশি বাস্তববাদী গুরুত্ব দেখা গেছে।
অর্থাৎ BRICS-এর প্রশ্নটি কেবল ডলারকে সরিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং একটি মাত্র আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ও বহুমুখী ব্যবস্থা তৈরি করার প্রশ্ন।
শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক চাপ: ছোট অর্থনীতির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে হয় না। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক লেনদেনে বাধা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ—এসবও আন্তর্জাতিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
বড় অর্থনীতিগুলো এসব উপকরণ ব্যবহার করলে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
এ কারণে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে যত বেশি সম্ভব বহুমুখী করা গুরুত্বপূর্ণ। একক বাজার, একক সরবরাহকারী, একক আর্থিক ব্যবস্থা বা একক ভূরাজনৈতিক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই জায়গায় BRICS বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য একটি অতিরিক্ত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং সব বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের বিকল্পগুলো বাড়ানো।
BRICS কি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রাখা প্রয়োজন।
BRICS-কে সরাসরি “যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সামরিক বা রাজনৈতিক জোট” হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবসম্মত নয়। BRICS-এর সদস্যদের মধ্যেও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
বরং BRICS-কে দেখা যেতে পারে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে, যেখানে Global South-এর বড় ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় নিজেদের প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বিকল্প সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
২০২৬ সালের New Delhi Declaration-এও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়ে সদস্যদের অবস্থান প্রতিফলিত হয়েছে।
তাই বাংলাদেশের জন্য BRICS-এ যাওয়ার অর্থ আমেরিকার বিরুদ্ধে যাওয়া নয়; বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করা।
ভারতের ভূমিকা: গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র নয়
বাংলাদেশের BRICS-যাত্রায় ভারত নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ।
ভারত শুধু BRICS-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নয়; ২০২৬ সালে ভারত সংগঠনটির সভাপতিত্বও করেছে এবং নয়াদিল্লিতে ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য, সীমান্ত, যোগাযোগ, জ্বালানি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং BIMSTEC—সবকিছু বিবেচনায় ভারত বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
তবে এখানেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলের সূক্ষ্ম জায়গাটি রয়েছে।
ভারতের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু BRICS-এর পথকে শুধু ভারতের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
বাংলাদেশকে একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যের BRICS সদস্য এবং অন্যান্য Partner Country-র সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে হবে।
অর্থাৎ কৌশলটি হওয়া উচিত—
ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা, সবার সঙ্গে যোগাযোগ এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুপাক্ষিক কূটনীতি।
বাংলাদেশের জন্য Partner Country কি বাস্তবসম্মত পথ?
২০২৬ সালের BRICS কাঠামোতে Partner Country ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে ১০টি দেশ এই কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। ২০২৬ সালের নয়াদিল্লি সম্মেলনে Partner Country-গুলোর আরও বিস্তৃত অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাই বাংলাদেশ চাইলে প্রথম পর্যায়ে পূর্ণ সদস্যপদকে একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে Partner Country হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কূটনৈতিকভাবে কাজ করতে পারে।
তবে Partner Country হওয়া ভবিষ্যতে পূর্ণ সদস্যপদের নিশ্চয়তা—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। এটি আলাদা একটি সহযোগিতার কাঠামো।
তবুও এই মর্যাদা বাংলাদেশকে BRICS-এর অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত ও নীতিগত আলোচনার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
বাংলাদেশ কেন BRICS-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?
বাংলাদেশ শুধু সদস্যপদ চাইবে—এমন কূটনীতি যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশকে বরং দেখাতে হবে—
“BRICS-এর জন্য বাংলাদেশ কী মূল্য তৈরি করতে পারে?”
বাংলাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি রয়েছে:
- বৃহৎ ভোক্তা ও শ্রমবাজার
- তৈরি পোশাকশিল্প
- কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন
- বিপুল প্রবাসী আয়
- বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভৌগোলিক অবস্থান
- চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর
- দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগের সম্ভাবনা
- ডিজিটাল অর্থনীতি
- নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা
- জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা
- BIMSTEC-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা
এসবকে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক প্রস্তাব হিসেবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের করণীয় কী?
১. BRICS Partnership and Membership Strategy তৈরি
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি সুসংগঠিত BRICS কৌশলপত্র তৈরি করা যেতে পারে।
সেখানে বাংলাদেশের—
- বাণিজ্য
- বিনিয়োগ
- বন্দর
- জ্বালানি
- খাদ্য নিরাপত্তা
- ডিজিটাল অর্থনীতি
- প্রযুক্তি
- জলবায়ু
- আঞ্চলিক যোগাযোগ
- BIMSTEC
- বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি
এসব বিষয় তুলে ধরা যেতে পারে।
২. ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক কূটনীতি
বাংলাদেশ-ভারতের যেসব ক্ষেত্রে অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে, সেগুলোতে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
আবার সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য বা অন্য কোনো দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলে তা সমতা, মর্যাদা ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
BRICS-এর স্বার্থে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে উন্নত করা যেমন জরুরি, তেমনি BRICS-কে ব্যবহার করে দ্বিপাক্ষিক বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করাও উচিত নয়।
৩. শুধু ভারতের ওপর নির্ভর না করা
চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে পৃথকভাবে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের বার্তা হওয়া উচিত—
“আমরা কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে নই; আমরা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে।”
৪. স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের সম্ভাবনা যাচাই
বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে, কোন কোন দেশের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বা বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থায় বাণিজ্য করা বাস্তবসম্মত হতে পারে।
তবে ডলারকে একদিনে বাদ দেওয়ার কোনো বাস্তব প্রয়োজন নেই। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত বিকল্প বাড়ানো এবং ঝুঁকি কমানো।
৫. New Development Bank-এর সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা
BRICS-এর New Development Bank বা NDB উন্নয়ন অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের উচিত এর সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা, প্রকল্প অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সুযোগ নিয়ে কূটনৈতিকভাবে অনুসন্ধান চালানো।
৬. বঙ্গোপসাগরকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে তুলে ধরা
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সম্পদগুলোর একটি হলো বঙ্গোপসাগর।
দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান BRICS-এর বাণিজ্য ও যোগাযোগ কাঠামোর আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
৭. “সদস্যপদ চাই” থেকে “অংশীদার হতে চাই”
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভাষায় একটি পরিবর্তন দরকার।
শুধু—
“বাংলাদেশকে BRICS-এর সদস্য করা হোক”
এই দাবি যথেষ্ট নয়।
বরং বলা দরকার—
“বাংলাদেশ BRICS-এর অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগিতায় কীভাবে কার্যকর অবদান রাখতে পারে এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ কী বাস্তব সুবিধা পেতে পারে—তার একটি সুস্পষ্ট প্রস্তাব আমরা দিতে চাই।”
বাংলাদেশের জন্য BRICS-এর সম্ভাব্য সুফল
BRICS-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য কয়েকটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাণিজ্য: নতুন বাজার ও বিকল্প বাণিজ্য অংশীদার তৈরি হতে পারে।
বিনিয়োগ: বড় উদীয়মান অর্থনীতির বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ বাড়তে পারে।
জ্বালানি: বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তি: ডিজিটাল প্রযুক্তি, AI, শিল্পপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে সহযোগিতা বাড়তে পারে।
অবকাঠামো: উন্নয়ন অর্থায়ন ও বড় প্রকল্পে সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
আর্থিক নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও বাণিজ্যে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।
কূটনীতি: Global South-এর বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে BRICS নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশাও ঠিক নয়
BRICS কোনো জাদুর কাঠি নয়।
এখানেও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আছে, অর্থনৈতিক স্বার্থে পার্থক্য আছে এবং অনেক বিষয়ে অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছানো কঠিন।
সুতরাং বাংলাদেশ BRICS-এ যুক্ত হলেই অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনীতি, রপ্তানি সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা, উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন শক্তিশালী করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কূটনীতির মূলনীতি কী হওয়া উচিত?
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে—
এক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নয়, বরং বহু দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও সম্পর্ক থাকবে।
ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।
রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।
BRICS-এর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়বে।
BIMSTEC, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মেও সক্রিয় থাকবে বাংলাদেশ।
অর্থাৎ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি হওয়া উচিত বহুমুখীকরণ—বৈরিতা নয়।
শেষ কথা: ভারতের সমর্থন দরকার, কিন্তু বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের
BRICS আজ আর কেবল চারটি বা পাঁচটি উদীয়মান অর্থনীতির সংগঠন নয়। ২০২৬ সালে এর পূর্ণ সদস্য সংখ্যা ১১ এবং Partner Country ১০। নয়াদিল্লির ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনও দেখিয়েছে যে সংগঠনটি বাণিজ্য, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, জলবায়ু, আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা ও Global South-এর সহযোগিতার ক্ষেত্রে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে সেই ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সম্ভাব্য ঝুঁকি, নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও বাণিজ্যিক চাপের বাস্তবতাও ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিবেচনায় রাখতে হয়।
এই বাস্তবতায় BRICS-এর প্রয়োজনীয়তা হলো কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে নতুন মেরুকরণ তৈরি করা নয়; বরং বহুমুখী অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিকল্প পেমেন্টব্যবস্থা, Global South-এর অধিকতর প্রতিনিধিত্ব এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় ভারসাম্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশের জন্য তাই BRICS একটি সুযোগ—কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আবেগ নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত কূটনীতি।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সমর্থন BRICS-এর পথে বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের কৌশল শুধু ভারতের ওপর নির্ভরশীল হলে তা হবে একমুখী কূটনীতি।
বরং বাংলাদেশের উচিত ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে পাশে রেখে চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্যান্য BRICS ও Partner Country-র সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত—কোনো শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়; বরং নিজের শক্তি বাড়ানো।
BRICS-এ বাংলাদেশের পথ ভারতের সমর্থনে সহজ হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের গন্তব্য, কৌশল ও সিদ্ধান্ত হতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
সহযোগিতা সবার সঙ্গে, বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে—কিন্তু জাতীয় স্বার্থ সবার আগে।
মুহাম্মদ আনিছুল ইসলাম আশরাফী
সাংবাদিক ও লেখক
সম্পাদক, আমার সিলেট টুয়েন্টিফোর ডটকম
সভাপতি, শ্রীমঙ্গল অনলাইন প্রেসক্লাব
