শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশীদ্রোন ইউনিয়নের হোসনাবাদ চা বাগানে একটি মুসলিম পরিবারের ওপর হামলা, শ্লীলতাহানি, দোকানে ভাঙচুর ও টাকা-মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে পরিবারের প্রবীণ সদস্যকে দাড়ি ছিঁড়ে ফেলার হুমকি এবং দীর্ঘদিন ধরে বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হোসনাবাদ চা বাগানের বসতবাড়ি সংলগ্ন মুদি ও দর্জির দোকানে এ ঘটনা ঘটে বলে থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী গৃহবধূ মর্জিনা বেগম (২৫) বাদী হয়ে মঞ্জু রাজবল্লব (৪০), সঞ্জু রাজবল্লব (৩৫)সহ চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করার কথা উল্লেখ করে শ্রীমঙ্গল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি। পুলিশ অভিযোগটি তদন্ত করছে এবং তদন্তের পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ঘরের চালের বৃষ্টির পানি পড়া ও সীমানা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, বিরোধকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হচ্ছিল এবং বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হচ্ছিল।
অভিযোগে বলা হয়েছে,একপর্যায়ে মর্জিনা বেগমের শ্বশুর মহরম আলীকে দাড়ি ছিঁড়ে ফেলার হুমকিসহ বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
ঘটনার দিন বৃষ্টির পানি চলাচল ও সীমানা নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের দোকানে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন মর্জিনা বেগম।
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার সময় মর্জিনা বেগমের জামাকাপড় টেনে শ্লীলতাহানি করা হয়। তাকে কাস্তে দিয়ে আঘাত ও পেটে লাথি মেরে আহত করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। স্ত্রীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে সম্প্রতি অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অপারেশন করা তার স্বামী সোহেল মিয়া (৩৫)-কেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় দোকানের ক্যাশ বাক্স থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং প্রায় ১০ হাজার টাকা মূল্যের অর্ডার করা পোশাক নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আরও প্রায় ১০ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
তাদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলে যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনায় আহত মর্জিনা বেগম ও সোহেল মিয়া পরে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন বলে জানা গেছে।
তবে তাদের আঘাতের ধরন ও চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য চিকিৎসা নথির ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ঘটনার বিষয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মহরম আলীর বসতঘর থেকে মঞ্জু রাজবল্লবের উঠান আনুমানিক দেড় ফুট নিচু। বাড়িটির পূর্ব পাশে একটি পাহাড়ি টিলা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃষ্টির সময় উঁচু জায়গা থেকে নিচু এলাকায় পানি গড়িয়ে আসাকে কেন্দ্র করেই দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত।
ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের আশপাশের এলাকায় প্রায় ৩০টি পরিবারের বসবাসের কথা বলা হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাগানের বিস্তৃত এলাকায় আরও কয়েকটি মুসলিম পরিবার রয়েছে। তবে এসব পরিবার পাশাপাশি বসবাস করে না; পাহাড়ি ও অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে তাদের বসতি রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মহরম আলীর পরিবার যে এলাকায় বসবাস করছে, সেখানে হিন্দু পরিবারগুলোর বসতি তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি। অন্য মুসলিম পরিবারগুলো ওই এলাকা থেকে বেশ দূরে দূরে বসবাস করে।
তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সামগ্রিকভাবে এলাকায় হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে। তাদের দাবি, অন্য মুসলিম পরিবারগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের বিরোধ নেই; বর্তমান সমস্যাটি মূলত সংশ্লিষ্ট দুই পরিবারের মধ্যকার বিরোধ।
স্থানীয় এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, মঞ্জু রাজবল্লব নিয়মিত নেশা করেন এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বেপরোয়া আচরণ করেন।
তবে ওই ব্যক্তি স্পষ্ট করেন, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না; অন্যদের কাছ থেকে বিষয়টি শুনেছেন। ফলে তার এ বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মহরম আলীকে দাড়ি ছিঁড়ে ফেলার হুমকি দেওয়া এবং দোকান থেকে টাকা ও মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মঞ্জু রাজবল্লব ও তার স্ত্রী।
মঞ্জু রাজবল্লব বলেন, মূল বিরোধের বিষয় সীমানা ও বৃষ্টির পানি। তার দাবি, উঁচু জায়গা থেকে নিচু জায়গায় বৃষ্টির পানি গড়িয়ে আসা স্বাভাবিক। পাশের বড় পাহাড়ি এলাকা থেকে পানি ইচ্ছা করলেই বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তবে মহরম আলীর ঘরের পানি তাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিরোধটি স্থানীয়ভাবে সমাধানের জন্য পঞ্চায়েতের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সবাইকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।
পঞ্চায়েতের সদস্য খোকন মিয়া প্রথমে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও পরে ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা বলে চলে যান। পরবর্তীতে ফোনে তিনি জানান, স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
ঘটনার বিষয়ে হোসনাবাদ টি গার্ডেনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার আমিনুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বাগানে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান—সবাইকে নিয়ে তারা একটি পরিবারের মতো বসবাস করছেন এবং কর্তৃপক্ষ সবাইকে সমানভাবে দেখে।
তিনি বলেন, এ বিরোধের বিষয়টি তার কাছেও এসেছে। মহরম আলী তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। পরে তিনি বিষয়টি স্থানীয় পঞ্চায়েতকে দেখার জন্য পাঠান। পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে সমাধান হয়নি বলে জানান তিনি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, মূলত জায়গাটির মালিক বাগান কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার কারণেই সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো সেখানে বসবাস ও জায়গা ব্যবহার করতে পারছে। নিজেদের মধ্যে মিলেমিশে না চললে শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি সংশ্লিষ্টদেরই ভোগ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মর্জিনা বেগমের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর শ্রীমঙ্গল থানার এসআই দেলোয়ার ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।
এসআই দেলোয়ার বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করেছেন। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
থানা সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা পাওয়া গেলে অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ডসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ঘটনাটি নিয়ে একদিকে হামলা, শ্লীলতাহানি, টাকা ও মালামাল নিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে; অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মূল বিরোধকে সীমানা ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনকেন্দ্রিক বলে দাবি করছে।
এ অবস্থায় অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের পানি নিষ্কাশন ও সীমানা-সংক্রান্ত বিরোধের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে বাগান কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় পঞ্চায়েত ও প্রশাসনের সমন্বয়ে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
মামলা রেকর্ড হলে তদন্তের অগ্রগতি, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
