আনোয়ার হোসেন রনি, ছাতক থেকে: দুই দফা ভয়াবহ ব্লোআউট বা বিস্ফোরণের ঘটনায় দীর্ঘ দুই দশক বন্ধ থাকার পর সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার আলোচিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে আবারও গ্যাস অনুসন্ধানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, টেংরাটিলায় প্রাথমিকভাবে দুটি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাপেক্স ইতোমধ্যে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) তৈরির কাজ শুরু করেছে। সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে আগামী বছর থেকেই খনন কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
২০০৫ সালে কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস কূপ খননের সময় জানুয়ারি ও জুন মাসে দুই দফা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায় এবং পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্ট হয়েছিল।
দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত ইকসিড নাইকোকে বাংলাদেশকে ৪২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর পরই নতুন করে টেংরাটিলায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত সামনে আসে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, টেংরাটিলার পূর্বাংশে প্রথমে কূপ খনন করা হবে। পরে পশ্চিম জোনে কাজ এগোবে। দুর্ঘটনাস্থল এড়িয়ে ত্রিমাত্রিক জরিপের মাধ্যমে নতুন স্থান নির্ধারণ করা হবে।
ভূতত্ত্ববিদ ড. বদরুল ইমাম মনে করেন, টেংরাটিলায় এখনো উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, “বিস্ফোরণের কারণে ক্ষেত্রটির উন্নয়ন থেমে গেলেও এখানে ভালো গ্যাস মজুত থাকার সম্ভাবনা আছে। তাই নতুন করে কূপ খননের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেংরাটিলাসহ দোয়ারাবাজার গ্যাসক্ষেত্রে দুই থেকে তিন ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস রিসোর্স থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকৃত উত্তোলনযোগ্য মজুত জানতে নতুন জরিপ ও কূপ খনন জরুরি।
বর্তমানে দেশে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট প্রমাণিত গ্যাস মজুতের বড় অংশ ইতোমধ্যে উত্তোলন হয়ে গেছে। ফলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
তবে বাপেক্সের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গভীর কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, আধুনিক রিগ ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে বিদেশি প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
ড. বদরুল ইমাম বলেন, “ডিপ ড্রিলিং করতে হলে উন্নত সরঞ্জাম ও দক্ষতা দরকার। বাপেক্সকে ভবিষ্যতে এ সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, তবে শুরুতে বিদেশি সহযোগিতা লাগতে পারে।”
টেংরাটিলার অতীত বিস্ফোরণ, ক্ষয়ক্ষতি এবং বিতর্কিত চুক্তির স্মৃতি এখনো স্থানীয়দের মনে রয়েছে। তাই নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম নিরাপদ ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
