সম্প্রতি ঢাকাভিত্তিক একটি শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনের একজন সম্মানিত নেতার একটি বক্তব্য আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তিনি মফস্বল এলাকায় সাংবাদিকের সংখ্যাধিক্য এবং বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নেতা হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা, অবদান ও অবস্থানের প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা রয়েছে। একই সঙ্গে আমি বিশ্বাস করি, সাংবাদিকতা নিয়ে যেকোনো গঠনমূলক আলোচনা আমাদের পেশাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে, যা আলোচনায় সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। কারণ কোনো সমস্যার একটি মাত্র দিক বিশ্লেষণ করলে অনেক সময় মূল সংকট আড়ালেই থেকে যায়। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকতার মতো একটি সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে আমাদের আরও সতর্ক, বাস্তবতানির্ভর এবং ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
স্বামী-স্ত্রী বা একই পরিবারের সদস্য সাংবাদিকতা করলে—সেটিই কি মূল সমস্যা?
প্রথমেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন কিংবা সাংবাদিকতার স্বীকৃত নীতিমালার কোথাও কি বলা আছে যে স্বামী-স্ত্রী বা একই পরিবারের একাধিক সদস্য সাংবাদিকতা করতে পারবেন না? আমার জানা মতে, এমন কোনো বিধান নেই।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বহু স্বনামধন্য সাংবাদিক দম্পতি এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে পেশাদারিত্ব, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে সাংবাদিকতা করে আসছেন। তাঁদের পরিচয় কখনো পারিবারিক সম্পর্ক নয়; বরং তাঁদের কাজই তাঁদের পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি।
বাস্তবতাও তাই বলে। সাংবাদিকতা কোনো পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়; এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তির নৈতিকতা, যোগ্যতা, মেধা, সাহস এবং পেশাগত দায়বদ্ধতার বিষয়। একই পরিবারের একজন অসৎ হলেই অন্যজনও অসৎ হবেন—এমন ধারণা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি একজন সৎ হলেই সবাই সৎ—এ ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।
আমাদের সমাজেই অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে এক ভাই অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন, অথচ অন্য ভাই সততা, দক্ষতা ও নৈতিকতার সঙ্গে নিজের পেশাগত অবস্থান ধরে রেখেছেন। আবার এর বিপরীত উদাহরণও আছে। সুতরাং সম্পর্ক নয়, মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত ব্যক্তির যোগ্যতা, সততা, নৈতিকতা এবং পেশাগত দক্ষতা।
সমস্যা পরিবারে নয়, সমস্যা অনিয়ম ও প্রেস কার্ড বাণিজ্যে
আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি হলো—মফস্বল সাংবাদিকতার সংকটের মূল কারণ স্বামী-স্ত্রী বা একই পরিবারের সদস্যদের সাংবাদিকতায় আসা নয়। প্রকৃত সংকট তৈরি হয় তখন, যখন যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নৈতিকতা যাচাই ছাড়াই অর্থ, প্রভাব বা অন্য কোনো অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে সাংবাদিক পরিচয় বা প্রেস কার্ড প্রদান করা হয়।
যদি কোনো ব্যক্তি নিজের মেধা, পরিশ্রম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সাংবাদিকতায় আসেন, তাহলে তাঁর পারিবারিক পরিচয় কখনোই বিচার্যের বিষয় হওয়া উচিত নয়। কিন্তু যখন অযোগ্য ব্যক্তিকে শুধু আর্থিক লেনদেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা প্রভাবের কারণে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া হয়, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—পুরো সাংবাদিক সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমরা কি সমস্যার মূল শিকড়ে আঘাত করছি, নাকি সহজ একটি বিষয়কে বড় করে তুলে প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করছি?
দায়িত্বশীল বক্তব্যেরও সামাজিক প্রভাব রয়েছে
সাংবাদিক সমাজের শীর্ষস্থানীয় নেতা, গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারকদের প্রতিটি বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাঁদের একটি মন্তব্য শুধু একটি সভা বা সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনমতের মাধ্যমে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
এ কারণেই এমন বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি সাধারণীকৃত মন্তব্য অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই মানুষদেরও প্রশ্নবিদ্ধ করে, যারা দীর্ঘদিন ধরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সাংবাদিকতা করে আসছেন।
আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সাংবাদিকতাবিরোধী কিছু ব্যক্তি এবং সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অপকর্মে জড়িত একটি অসাধু চক্র এ ধরনের বক্তব্যকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। তারা কখনো প্রকাশ্যে, কখনো নীরবে বলে বেড়ায়—”দেখুন, জাতীয় পর্যায়ের নেতারাও তো মফস্বল সাংবাদিকদের সম্পর্কে এমন কথাই বলেছেন।”
ফলে প্রকৃত ও সৎ সাংবাদিকরা যেমন অযথা বিব্রত হন, তেমনি অপসাংবাদিকরাও নিজেদের দায় আড়াল করার একটি সুযোগ পেয়ে যায়।
আমাদের বিনীত প্রত্যাশা—সম্মানিত সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ যখন কোনো সমস্যা নিয়ে কথা বলবেন, তখন যেন সমস্যার প্রকৃত উৎসকে চিহ্নিত করেন। বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়মের দায় যেন পুরো মফস্বল সাংবাদিক সমাজের ওপর বর্তায় না। কারণ একটি বিচক্ষণ বক্তব্য যেমন ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে, তেমনি একটি অসতর্ক সাধারণীকরণ অনিচ্ছাকৃতভাবে অসাধু চক্রের হাতেও একটি শক্তিশালী প্রচারণার অস্ত্র তুলে দিতে পারে।
দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতা ও এক তিক্ত বাস্তবতা
আমি ১৯৮৯ সাল থেকে কবিতা ও গল্প লেখার মাধ্যমে কলমের সঙ্গে যুক্ত এবং ১৯৯৪ সাল থেকে সরাসরি সাংবাদিকতার পেশায় আছি। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা, প্রলোভন এবং চাপের মধ্যেও সততা ও নৈতিকতাকে ধারণ করে এই পেশায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছি। এই দীর্ঘ পথচলায় যেমন অসংখ্য ভালো মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি, তেমনি এমন কিছু তিক্ত বাস্তবতারও মুখোমুখি হয়েছি, যা একজন সাংবাদিক হিসেবে আজও আমাকে ব্যথিত করে।
আমি এখানে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করছি, সেগুলোর একটি অংশ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আর একটি অংশ দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা জীবনে দেখা বাস্তবতা, সহকর্মীদের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক মহলে আলোচিত অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণের সমন্বয়। তাই বিষয়গুলোকে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়; বরং সাংবাদিকতা পেশার চলমান সংকট নিয়ে একটি দায়িত্বশীল মতামত হিসেবে বিবেচনা করার অনুরোধ রইল।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
১৯৯৮ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে মফস্বল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার বিষয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা হয়েছে। অনেকেই আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও কাজের প্রশংসা করেছেন। কিন্তু একাধিক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে আমাকে এক লাখ, দেড় লাখ, এমনকি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অনৈতিক আর্থিক দাবির সম্মুখীন হতে হয়েছে। এটি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
আরও কিছু অভিজ্ঞতা রয়েছে, যেগুলো এই মুহূর্তে প্রকাশ করা সমীচীন মনে করছি না। কারণ আমার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়; বরং সমস্যার প্রকৃত চিত্রটি সামনে আনা।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, একজন নৈতিকতাসম্পন্ন সাংবাদিকের পক্ষে এ ধরনের অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে একটি প্রেস কার্ড বা সাংবাদিক পরিচয় সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। কারণ যে অর্থ অন্যায়ভাবে ব্যয় করা হয়, তা একদিন না একদিন অন্যায় পথেই ফিরে আনার প্রবণতা তৈরি হতে পারে—এ আশঙ্কা অমূলক নয়।
যে বাস্তবতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে
দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা জীবনে বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে, সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করে আমার যে উপলব্ধি হয়েছে, তা হলো—কিছু ক্ষেত্রে প্রেস কার্ড বা সাংবাদিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ বহুদিন ধরেই রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে এমন অভিযোগও উঠে এসেছে যে, অযোগ্য ব্যক্তিরা আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে সাংবাদিক পরিচয় পাচ্ছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। তবে অভিযোগগুলো বারবার সামনে আসা আমাদের সবাইকেই আত্মসমালোচনার আহ্বান জানায়।
যদি এমন কোনো অনিয়ম কোথাও থেকে থাকে, তাহলে তার ক্ষতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং পুরো সাংবাদিক সমাজকে বহন করতে হয়। কারণ একজন অপসাংবাদিকের কারণে শত শত সৎ সাংবাদিকের সততা নিয়েও মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, যাঁরা সততার সঙ্গে বছরের পর বছর মাঠে কাজ করেন, তাঁদের অনেকেই যথাযথ মূল্যায়ন পান না। অথচ অভিযোগ রয়েছে—কিছু অসাধু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যবহার করছেন ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে তা শুধু পেশাগত নৈতিকতার পরিপন্থী নয়; সাংবাদিকতার মতো মহান পেশার জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।
আমার এই অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য নয়; বরং সাংবাদিক সমাজের ভেতরে আত্মশুদ্ধি ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।
কারণ আমি আজও বিশ্বাস করি—সাংবাদিকতার সংকটের সমাধান সাংবাদিকতার ভেতর থেকেই আসতে হবে। আত্মসমালোচনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নৈতিকতার বিকল্প নেই।
নীতিকথা বনাম বাস্তবতা: “চোরই যদি বলে—চোর পালায়, তবে কাকে ধরবেন?”
সাংবাদিকতা একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা। তাই পেশার শুদ্ধতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হওয়া উচিত। বরং যত বেশি আত্মসমালোচনা হবে, ততই সাংবাদিকতা শক্তিশালী হবে। কিন্তু সেই আত্মসমালোচনা যদি সমস্যার প্রকৃত উৎসকে স্পর্শ না করে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কখনোই আসবে না।
আজ আমরা প্রায়ই মফস্বল সাংবাদিকদের সংখ্যা, পারিবারিক পরিচয় কিংবা বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়ম নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তুলি—কেন এসব অনিয়ম সৃষ্টি হচ্ছে? কারা এই অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? কীভাবে অযোগ্য ব্যক্তিরা সাংবাদিক পরিচয় পাচ্ছেন? আর কেন প্রকৃত সাংবাদিকরা বারবার উপেক্ষিত হচ্ছেন?
আমার পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে, সমস্যার বড় একটি অংশ এখানেই লুকিয়ে আছে।
বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক সমাজে, বিভিন্ন আলোচনায় এবং গণমাধ্যমেও এমন অভিযোগ উঠে এসেছে যে, কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি নিয়োগ বা প্রেস কার্ড প্রদানকে ঘিরে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। তবে অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে ফিরে আসছে—এটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আর এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—যদি সমস্যার মূল উৎস চিহ্নিত না করে শুধু প্রান্তিক পর্যায়ের সাংবাদিকদের দোষারোপ করা হয়, তাহলে প্রকৃত অপরাধীরা কি আড়ালেই থেকে যাবে না?
অনেক সময় এমনও দেখা যায়, যারা প্রকাশ্যে নীতি, আদর্শ ও পেশাগত শুদ্ধতার কথা বলেন, তাঁদের আশপাশের পরিবেশ নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। আমি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছি না; বরং একটি বাস্তবতা তুলে ধরছি—যখন নীতির ভাষণ এবং বাস্তবতার মধ্যে ফারাক তৈরি হয়, তখন সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ কারণেই মানুষের মুখে সেই পুরোনো প্রবাদটি আজও ফিরে আসে—
“চোরই যদি বলে—চোর পালায়, তবে কাকে ধরবেন?”
এটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে বলা নয়; বরং একটি সামাজিক বাস্তবতার প্রতীক। যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের চারপাশেই যদি অনিয়মের অভিযোগ ঘুরপাক খায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম হয়।
সিন্ডিকেট, অপসাংবাদিকতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার
মফস্বলের বাস্তবতায় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যবহার করে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।
বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু ব্যক্তি জাতীয় বা প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়ে অযাচিত প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারে হস্তক্ষেপ, জমি-সংক্রান্ত বিরোধে পক্ষ নেওয়া, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি কিংবা অবৈধ সালিশের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আইনবিরোধী নয়, সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তিরও পরিপন্থী।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, একজন অপসাংবাদিকের কর্মকাণ্ডের দায় শেষ পর্যন্ত পুরো সাংবাদিক সমাজকেই বহন করতে হয়। ফলে একজন প্রকৃত সাংবাদিককেও অনেক সময় মানুষের কাছে নিজের সততার প্রমাণ দিতে হয়।
লোকদেখানো দ্বন্দ্ব, ভেতরে অভিন্ন স্বার্থ
দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে আরেকটি বিষয় আমার নজরে এসেছে।
মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা প্রকাশ্যে কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র বিরোধ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ দেখা যায়। সাধারণ মানুষ মনে করেন, তারা একে অপরের প্রতিপক্ষ।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই পরে দেখা যায়, সেই বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কোনো এক পর্যায়ে আবার তাদের মধ্যে সমঝোতা তৈরি হয়। এতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—এসব বিরোধ কি সত্যিই নীতিগত, নাকি কেবল স্বার্থের দ্বন্দ্ব?
এই প্রসঙ্গে শৈশবের একটি ঘটনা আজও মনে পড়ে।
১৯৮৪ বা ১৯৮৫ সালের কথা। আমাদের এলাকায় দুই চোরের মধ্যে একটি লাঠিকে কেন্দ্র করে তুমুল ঝগড়া হয়েছিল। পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেদিনই আসর ও মাগরিবের মাঝামাঝি সময়ে তাদের দুজনকে পাশের একটি পাটক্ষেতে পাশাপাশি বসে ধূমপান করতে দেখা গেল।ে
বিষয়টি এলাকার এক প্রবীণ মুরুব্বিকে জানালে তিনি হেসে বলেছিলেন—
«”এক চোর আরেক চোরের খালাতো ভাই। ওদের ঝগড়া স্বার্থ দিয়ে শুরু হয়, আবার স্বার্থের কারণেই শেষ হয়।”»
আজকের বাস্তবতায় সেই কথাটি প্রায়ই মনে পড়ে। কারণ কিছু অপসাংবাদিক চক্রের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বও অনেক সময় এমনই মনে হয়—বাইরে সংঘাত, ভেতরে অভিন্ন স্বার্থ।
অবশ্য এটি আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। সব ক্ষেত্রে এমন হয়—এ কথা আমি বলছি না। তবে যেখানে এমন প্রবণতা রয়েছে, সেখানে তা সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
এই কারণেই আমাদের বিশ্বাস, ব্যক্তি নয়—ব্যবস্থার সংস্কারই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান
দেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের সম্মানিত নেতৃবৃন্দ, সম্পাদক, প্রকাশক এবং জাতীয় গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারকদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রেখেই কয়েকটি কথা বলতে চাই।
মফস্বল সাংবাদিকতার সমস্যা নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু সেই আলোচনা যেন সমস্যার উপসর্গকে নয়, মূল কারণকে কেন্দ্র করে হয়। কারণ ভুল জায়গায় আঘাত করলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং প্রকৃত সমস্যাটি আরও আড়ালে চলে যায়।
আমাদের বিনীত প্রত্যাশা—
প্রথমত, প্রেস কার্ড বা প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং যোগ্যতাভিত্তিক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক।
দ্বিতীয়ত, সাংবাদিক পরিচয় প্রদানের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা, মাঠপর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতা এবং জনস্বার্থে কাজ করার মানসিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হোক।
তৃতীয়ত, যদি কোথাও প্রেস কার্ড বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম বা অপসাংবাদিকতার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
চতুর্থত, কয়েকজন ব্যক্তির অনিয়মের কারণে পুরো মফস্বল সাংবাদিক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা হোক।
আমাদের অঙ্গীকার
এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোও নয়।
বরং একজন দীর্ঘদিনের মফস্বল সাংবাদিক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই কথাগুলো বলছি।
আমি বিশ্বাস করি, সত্যকে আড়াল করে সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করা যায় না। আবার প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষারোপ করেও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
এ কারণেই আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—যদি সরকারের কোনো দায়িত্বশীল সংস্থা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা দেশের শীর্ষ সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কোনোটি সত্যিকার অর্থে মফস্বল সাংবাদিকতার পরিবেশকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে চায় এবং অপসাংবাদিকতা, প্রেস কার্ড বাণিজ্য কিংবা অনিয়মের অভিযোগগুলো তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করতে আগ্রহী হয়, তাহলে আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করতে আমরা প্রস্তুত আছি, ইনশাআল্লাহ।
আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা—বিচার যেন ব্যক্তি, সম্পর্ক বা প্রভাবের ভিত্তিতে নয়; বরং তথ্য, প্রমাণ, আইন এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে হয়।
আত্মসমালোচনার বিকল্প নেই
সাংবাদিক সমাজেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। কারণ কোনো পেশাই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।
যেখানে অনিয়ম আছে, সেখানে সংশোধনও থাকতে হবে। যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ আছে, সেখানে তদন্তও থাকতে হবে। আর যেখানে সৎ ও ত্যাগী সাংবাদিকরা নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন, সেখানে তাঁদের যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতিও নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা যদি নিজেদের ভেতরের অনিয়ম দূর করতে না পারি, তাহলে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়বে।
শেষ কথা
মফস্বল সাংবাদিকতা কোনো বোঝা নয়; বরং বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
রাজধানীর বাইরে সংঘটিত অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রথম সংবাদ সংগ্রহ করেন মফস্বলের সাংবাদিকরাই। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা মানুষের কথা তুলে ধরেন, সমাজের সমস্যাগুলো সামনে আনেন এবং জাতীয় গণমাধ্যমকে তথ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করেন।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—মফস্বলে কতজন সাংবাদিক আছেন।
প্রশ্ন হওয়া উচিত—কতজন যোগ্য, কতজন নৈতিক এবং কতজন প্রকৃত অর্থে জনস্বার্থে কাজ করছেন।
একইভাবে, স্বামী-স্ত্রী কিংবা একই পরিবারের সদস্য সাংবাদিকতায় আছেন কি না, সেটিও মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো—তাঁরা কি সততা, নৈতিকতা এবং পেশাগত দায়িত্ববোধের সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন?
যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে তাঁদের কর্মই হবে পরিচয়ের একমাত্র মানদণ্ড।
আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে তিনি যে-ই হোন—মফস্বলের, রাজধানীর, বড় প্রতিষ্ঠানের কিংবা ছোট প্রতিষ্ঠানের—আইন, নৈতিকতা এবং পেশাগত জবাবদিহির আওতায় তাঁকেও আসতে হবে।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সাংবাদিকতার লড়াই রাজধানী বনাম মফস্বলের লড়াই নয়; এটি নৈতিকতা বনাম অনৈতিকতা, যোগ্যতা বনাম অযোগ্যতা এবং সত্য বনাম অসত্যের লড়াই।
আসুন—
সম্পর্ক নয়, যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করি।
সংখ্যা নয়, গুণগত মানকে প্রাধান্য দিই।
পরিচয় নয়, সততাকে সম্মান করি।
মফস্বল নয়, অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই।
প্রেস কার্ড নয়, সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করি।
কারণ সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতার প্রতীক নয়, কোনো ব্যবসার লাইসেন্সও নয়; এটি সত্য অনুসন্ধান, জনস্বার্থ রক্ষা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের এক মহান অঙ্গীকার।
— মুহাম্মদ আনিছুল ইসলাম আশরাফী
সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট
