“মা বাবার দোয়া আয়াত পরিবহন” লেখার সূত্র ধরেই রহস্য উদ্ঘাটন
নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানাধীন কুমারশীল মোড় থেকে আশুগঞ্জে নিজ বাড়িতে যাওয়ার পথে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের হাতে খুন হয়েছেন জাহানারা বেগম। সিএনজির পেছনে লেখা “মা বাবার দোয়া আয়াত পরিবহন” সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানা পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং একাধিক আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ মে ২০২৬ দুপুর ৩টার দিকে জাহানারা বেগম সদর থানার কুমারশীল মোড় থেকে সিএনজিযোগে আশুগঞ্জে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রটি সিএনজির ভেতরেই তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। পরে বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে সদর থানার অষ্টগ্রাম এলাকায় রাস্তার পাশে তাকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। স্থানীয়রা উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর নিহতের ছেলে জুবায়েদুর রহমান খান ইমন বাদী হয়ে গত ১৮ মে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পরপরই সদর মডেল থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সিএনজির পেছনে “মা বাবার দোয়া আয়াত পরিবহন” লেখা দেখতে পায় পুলিশ। ওই সূত্র ধরেই ১৮ মে দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে সদর থানার ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি সিএনজি গ্যারেজ থেকে একই লেখাযুক্ত সিএনজিটি শনাক্ত করা হয় এবং চালক মো. বাদশাহকে গ্রেফতার করা হয়।
পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃত বাদশাহর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে উত্তর পৈরতলা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে শরীফ উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ।
এরপর শরীফ উদ্দিনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী রাত ৮টার দিকে সুলতানপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে রিমা আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে নিহত জাহানারা বেগমের ব্যবহৃত একটি সেলোয়ার, একটি উড়না ও একজোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়। পরে রিমার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার এক বান্ধবীর বাসা থেকে নিহতের আরও দুটি উড়না, একটি কামিজ ও একটি সেলোয়ার উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে, শরীফ উদ্দিনের তথ্যের ভিত্তিতে জোবায়ের হোসেন ওরফে হৃদয়ের একটি রক্তমাখা জিন্স প্যান্ট উদ্ধার করে পুলিশ, যা হত্যাকাণ্ডের সময় সে পরিধান করেছিল বলে জানা গেছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সব আলামত জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, জাহানারা বেগমকে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে সিএনজিতে তোলা হয়েছিল। ছিনতাইয়ে বাধা ও চিৎকার করলে দুর্বৃত্তরা তাকে ছুরিকাঘাত করে রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে যায়।
পুলিশ আরও জানায়, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা রয়েছে। রিমা আক্তারের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতনের একটি মামলা, বাদশাহর বিরুদ্ধে দুটি মাদক মামলা, শরীফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন ও মাদকসহ সাতটি মামলা এবং জোবায়ের হোসেন ওরফে হৃদয়ের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণ ও মানবপাচার আইনে সাতটি মামলা রয়েছে।
গ্রেফতারকৃত আসামিরা হলেন—
১. রিমা আক্তার, সুলতানপুর (মধ্যপাড়া), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর।
২. মো. বাদশাহ, বিরাসার (পান্না পুকুরের দক্ষিণ পাড়), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর।
৩. মো. শরীফ উদ্দিন, ভবানীপুর, আশুগঞ্জ; বর্তমানে উত্তর পৈরতলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর।
৪. জোবায়ের হোসেন ওরফে হৃদয়, নরসিংসার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃতদের ১৯ মে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে শরীফ উদ্দিন আদালতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এদিকে, এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সিএনজি, অটোরিকশা ও চালকদের তথ্যভিত্তিক একটি ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
