সম্পাদকীয় থেকে: শিশু ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের মতো ভয়াবহ ঘটনা সামনে এলে সমাজে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ক্ষোভ, বিচার দাবি এবং সহানুভূতি—সবই মানবিক প্রতিক্রিয়ার অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে: “সহানুভূতির নামে” ভিকটিম শিশুর ছবি, ভিডিও ও পরিচয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া।
এই প্রবণতা শুধু নৈতিক বিচ্যুতি নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে আইনগত সীমার সরাসরি লঙ্ঘন। বাংলাদেশের বিদ্যমান শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী শিশুর পরিচয় প্রকাশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট—ভিকটিম শিশুকে পুনরায় সামাজিক হয়রানি, মানসিক ট্রমা এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতি থেকে রক্ষা করা।
তবুও বাস্তবতা হলো, একটি অংশের মানুষ আবেগের বশে শিশুর মুখ, নাম, এলাকা ও পরিবারের পরিচয় পর্যন্ত প্রকাশ করে ফেলছেন। তারা মনে করেন, এতে ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো হয়। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো—এ ধরনের প্রকাশ শিশুকে দ্বিতীয়বার ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
আন্তর্জাতিক শিশু সুরক্ষা নীতিমালার অন্যতম প্রধান দিক হলো ভিকটিমের গোপনীয়তা রক্ষা। এই প্রেক্ষিতে UNICEF বারবার সতর্ক করেছে যে, যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুর পরিচয় প্রকাশ করা তার মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় এই নীতির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুর ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল কনটেন্টে পরিণত হয়। এর ফলে ভিকটিম একদিকে ট্রমার শিকার হয়, অন্যদিকে সামাজিক কৌতূহল, গুজব ও অনৈতিক মন্তব্যের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের প্রকাশ ভবিষ্যতে ভিকটিমের জন্য সামাজিক স্টিগমা তৈরি করতে পারে, যা তার শিক্ষা, কর্মজীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ন্যায়বিচারের দাবি যেখানে শক্তিশালী হওয়ার কথা, সেখানে অনেক সময় ভিকটিমের নিরাপত্তাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিকটিমকে কেন্দ্র করে গুজব, খোঁটা বা সুযোগ নেওয়ার প্রবণতাও অস্বীকার করার মতো নয়। এটি একটি ক্ষুদ্র কিন্তু ক্ষতিকর বাস্তবতা, যা ভিকটিমের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।
সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো—কিছু ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক, কমেন্ট এবং ভাইরাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় যেকোনো ধরনের সংবেদনশীল তথ্য পোস্ট করে ফেলছেন। তারা তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন, কিন্তু সেই পোস্টের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে কোনো বিবেচনা করছেন না।
বিশেষ করে শিশু বা নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। অনেকেই ভিকটিম শিশুর ভবিষ্যৎ, তার মানসিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে কোনো ভাবনা ছাড়াই ছবি, ভিডিও বা পরিচয় প্রকাশ করে দিচ্ছেন। তাদের কাছে তাৎক্ষণিক লাইক, কমেন্ট এবং ভাইরাল হওয়াই যেন প্রধান লক্ষ্য।
এই আচরণ বাইরে থেকে দেখলে হয়তো “সচেতনতা প্রকাশ” বা “ন্যায়বিচারের দাবি” মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে এটি ভিকটিমের জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। এর ফলে শিশুর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং মানসিক স্থিতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিশু বা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির জীবনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা না করে এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় প্রকাশনা শুধু অসচেতনতা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বহীন আচরণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। যা বাইরে থেকে সাময়িকভাবে “ভালো প্রচারণা” মনে হলেও বাস্তবে তা ভিকটিমের জন্য গভীর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সত্যিই ভিকটিমের পাশে দাঁড়াচ্ছি, নাকি তাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি? সহানুভূতির নামে যদি গোপনীয়তা ভঙ্গ হয়, তাহলে সেই সহানুভূতি শেষ পর্যন্ত ভিকটিমের জন্য নিরাপদ থাকে না।
রাষ্ট্রীয় আইন, গণমাধ্যমের নীতিমালা এবং সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছুরই মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ভিকটিমকে সুরক্ষা দেওয়া, তাকে প্রদর্শন করা নয়। বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি হলো ভিকটিমের মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা।
পরিশেষে বলা যায়, একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কেবল অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভিকটিমের প্রতি তার আচরণেও সেই সভ্যতা প্রতিফলিত হয়। ভিকটিম শিশুকে জনসমক্ষে উন্মুক্ত করে দেওয়া কোনো সহানুভূতি নয়—এটি এক ধরনের সামাজিক অসচেতনতা, যা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
