আমারসিলেট ডেস্ক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝে মাঝে এমন কিছু প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রথমে নিছক মজা বা ধাঁধা মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে সমাজের মানসিকতার এক অদ্ভুত প্রতিফলন। “নৌকায় পাঁচজন—কাকে ফেলে দেবেন?”—এ ধরনের পোস্টে অনেকেই হাস্যরসের ছলে “সাংবাদিক”কে বেছে নেন। কিন্তু লক্ষ করার বিষয়, এই মন্তব্যকারীদের অনেকেই আবার প্রতিদিন বিভিন্ন সাংবাদিকের সংবাদ নিজেদের পেইজে শেয়ার করেন এবং তথ্য সংগ্রহে সেই সাংবাদিকদের কাজের ওপরই নির্ভরশীল থাকেন। এই দ্বিচারিতার পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করা জরুরি।
এর আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন—রাষ্ট্র বা সমাজ গঠনে কোনো পেশাকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। একটি হাতের পাঁচটি আঙুল যেমন একত্রে হাতকে পূর্ণতা দেয়, তেমনি বিভিন্ন পেশার মানুষের সমন্বয়েই আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এখন আসা যাক মূল আলোচনায়।
প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বহীন স্বাধীনতা একটি বড় কারণ। এখানে মানুষ অনেক সময় নিজের কথার প্রভাব বা দায়বদ্ধতা বিবেচনা না করেই মন্তব্য করে। বাস্তবে যা বলা যায় না, অনলাইনে তা সহজেই বলে ফেলা হয়। ফলে “সাংবাদিককে ফেলে দাও” ধরনের মন্তব্য অনেকের কাছে নিছক মজা হলেও এর সামাজিক প্রভাব মোটেও হালকা নয়।
দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকতা সম্পর্কে ভুল ধারণা ও আস্থার সংকট। সমাজের একটি অংশ মনে করে, সব সাংবাদিকই পক্ষপাতদুষ্ট বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করেন। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে পুরো পেশাটিকেই অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো—অধিকাংশ সাংবাদিক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
তৃতীয়ত, এখানে কাজ করে হীনমন্যতা ও জনপ্রিয়তার মনস্তত্ত্ব। সাংবাদিকরা সাধারণত তথ্যের কেন্দ্রে থাকেন এবং অনেকের কাছে পরিচিত মুখ। এই দৃশ্যমানতা কখনো কখনো অন্যদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি বা প্রতিযোগিতার অনুভূতি তৈরি করে, যা ঠাট্টা-বিদ্রূপের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
চতুর্থত, দ্বৈত নির্ভরশীলতা। মানুষ একদিকে সাংবাদিকদের কাজকে ব্যবহার করে—খবর জানতে, শেয়ার করতে এবং নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে; অন্যদিকে সুযোগ পেলে তাদেরকেই আক্রমণ করে। এটি এক ধরনের সামাজিক বৈপরীত্য, যেখানে প্রয়োজন ও মনোভাব পরস্পরবিরোধী।
আইনি দৃষ্টিকোণ:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অযথা অপমানজনক, মানহানিকর বা হুমকিমূলক মন্তব্য করলে বাংলাদেশের আইনে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
Digital Security Act 2018 অনুযায়ী, অনলাইনে মিথ্যা বা মানহানিকর তথ্য প্রচার শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
Bangladesh Penal Code 1860 এর ৪৯৯ ও ৫০০ ধারায় মানহানি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
প্রয়োজনে সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ দায়ের করে আইনি প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে।
তবে মনে রাখা জরুরি—গঠনমূলক সমালোচনা সবসময় বৈধ; কিন্তু মিথ্যা অপবাদ, গালি বা ব্যক্তিগত আক্রমণ আইনের চোখে অপরাধ।
পরিশেষে বলা যায়, এই প্রবণতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মত প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা, যা রাষ্ট্র ও সমাজে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সমালোচনা হোক যুক্তিনির্ভর ও শালীন; বিদ্রূপ বা অবমূল্যায়ন নয়।
আমাদের উচিত, অনলাইনে যেকোনো মন্তব্য করার আগে একবার ভেবে নেওয়া—এটি কি কেবল হাস্যরস, নাকি এর মাধ্যমে আমরা অজান্তেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাকে হেয় করছি? সচেতনতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধ বাড়লেই এ ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা কমে আসবে।
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট: আনিছুল ইসলাম আশরাফী
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
