আফজাল হোসেন রুমেল :বাংলাদেশের সুগন্ধি শিল্পে আগর-আতরের সমার্থক নাম মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই শিল্প আজ দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের প্রাকৃতিক রপ্তানি খাত। পাথারিয়া পাহাড়ঘেরা এই জনপদে উৎপাদিত আগর কাঠ, আগর তেল বা ‘উদ’ এবং আতর দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে সমাদৃত।
বৈশ্বিক বাজারে প্রাকৃতিক সুগন্ধির চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই তুলনায় বড়লেখার আগর-আতর শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক বিপণন এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ নীতিসহায়তা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই শিল্প দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চমূল্যের রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।
শতবর্ষের ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা শিল্প
ইতিহাস বলছে, প্রাচীনকাল থেকেই আরব বণিকরা উপমহাদেশে আগর কাঠের বাণিজ্য করতেন। তাঁদের হাত ধরেই এ অঞ্চলে আগর ও আতরের পরিচিতি বিস্তার লাভ করে বলে ধারণা করা হয়। তবে বড়লেখায় পরিকল্পিতভাবে আগর চাষের সূচনা হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। আশির দশকে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে আগর চাষ ও আতর উৎপাদন বাণিজ্যিক রূপ পেতে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে এটি বড়লেখার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়।
আগরগাছের প্রকৃত মূল্য এর সাধারণ কাঠে নয়; বরং সংক্রমণের ফলে গাছের ভেতরে তৈরি হওয়া রজনসমৃদ্ধ কালচে অংশে। স্থানীয়ভাবে এই অংশকে বলা হয় ‘মাল’। এই রজন থেকেই আহরণ করা হয় আগর তেল বা ‘উদ’, যা বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান প্রাকৃতিক সুগন্ধি উপাদান।
শুধু আগর তেল নয়—আগর কাঠের চিপস, গুঁড়া ও ধূপজাত পণ্যেরও আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। ফলে একটি আগরগাছের প্রায় প্রতিটি অংশই অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান।
২৫-৩০ বছরের অপেক্ষা, তারপর সুগন্ধির মূল্য
বড়লেখার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের মানুষ কোনো না কোনোভাবে আগর শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কেউ আগর বাগান গড়ে তুলেছেন, কেউ কাঠ প্রক্রিয়াজাত করছেন, কেউ আতর উৎপাদন করছেন, আবার কেউ রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
একটি আগরগাছ বাণিজ্যিকভাবে পরিপক্ব হতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর সময় লাগে। দীর্ঘদিন পরিচর্যা ও ধৈর্যের পর সেই গাছ থেকেই তৈরি হয় উচ্চমূল্যের পণ্য। ফলে আগর চাষ গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
এই শিল্পের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু কাঁচামাল নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা কারিগরি দক্ষতা। কাঠ বাছাই, রজনসমৃদ্ধ অংশ আলাদা করা, শুকানো, কুচি করা, পানিতে ভিজিয়ে রাখা এবং শেষ পর্যন্ত পাতন প্রক্রিয়ায় আগর তেল আহরণ—প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার।
বড়লেখার দক্ষিণভাগ ইউনিয়নের দোহালিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের শত শত কারিগর প্রজন্মের এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তাঁদের দক্ষ হাতে তৈরি আগর কাঠ ও আগর তেল পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সুগন্ধি শিল্পে।
বিশ্ববাজারে বাড়ছে চাহিদা
বড়লেখার আগর-আতর শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি এর আন্তর্জাতিক বাজার। প্রাকৃতিক সুগন্ধির প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগর তেল ও আতরের চাহিদাও বাড়ছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সুগন্ধি শিল্প, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের বিলাসবহুল পারফিউম বাজারে প্রাকৃতিক আগর তেলের কদর রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য আগর-আতর একটি সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্য হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন, গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং ও বাজার সম্প্রসারণে এখনো কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয়নি। উদ্যোক্তাদের মতে, নীতিগত জটিলতা ও প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতিও শিল্পটির বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে সুজানগর, দক্ষিণভাগ, শাহবাজপুর ও কাঠালতলী এলাকায় কয়েক হাজার উদ্যোক্তা এবং অসংখ্য আতর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা সক্রিয় রয়েছে। এ শিল্প শুধু বড়লেখার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে না, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জিআই স্বীকৃতিতে নতুন সম্ভাবনা
২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ‘মৌলভীবাজারের আগর’ ও ‘মৌলভীবাজারের আগর আতর’ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই স্বীকৃতি শুধু দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের স্বীকৃতি নয়; আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব সুগন্ধি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তবে জিআই স্বীকৃতির পূর্ণ সুফল পেতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক নিবন্ধন, আধুনিক প্যাকেজিং, কার্যকর ব্র্যান্ডিং, মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ।
চাষিদের দীর্ঘ অপেক্ষা
তিন দশকের বেশি সময় ধরে আগর চাষের সঙ্গে যুক্ত জামাল উদ্দিন বলেন, একটি আগরগাছকে বাণিজ্যিকভাবে উপযোগী করতে দীর্ঘ সময় পরিচর্যা করতে হয়।
তিনি জানান, আগে সংক্রমণ ঘটাতে গাছে পেরেক ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে বাজারে প্রাকৃতিকভাবে সংক্রমিত কাঠের চাহিদা বাড়ায় সেই পদ্ধতি অনেকটাই পরিত্যক্ত হয়েছে। গাছ পরিপক্ব হলে পাইকাররা বাগানে এসে কাঠের মান ও রজনের পরিমাণ বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণ করেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহেদ আহমদ ও এমদাদ হোসেন রুহেল জানান, বাগান মালিকদের কাছ থেকে আগরগাছ কেনার পর প্রথমে তা বিভিন্ন আকারে কেটে চিপস বা ডাস্ট তৈরি করা হয়। পরে সেগুলো প্রক্রিয়াজাতকারীদের কাছে বিক্রি করা হয়। প্রক্রিয়াজাতকারীরা এসব কাঁচামাল থেকে আগর তেল ও আতর উৎপাদন করেন।
কারিগরদের হাতেই তৈরি হয় সুগন্ধির ভিত্তি
দক্ষিণভাগ ইউনিয়নের দোহালিয়া গ্রামের শ্রমিকেরা দিনের পর দিন নিভৃতে কাজ করে আগর কাঠের রজনসমৃদ্ধ অংশ আলাদা করেন। স্থানীয়ভাবে ‘পাছরানী’ নামে পরিচিত এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার পর কাঠ শুকিয়ে বাজারজাতের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
কারিগরদের ভাষায়, তাঁদের শ্রমের সুবাসই একসময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়।
গোল্ডেন বাংলা পারফিউমের স্বত্বাধিকারী আবুল কাসেম বলেন, আগর শিল্পের উন্নয়নে একটি বিশেষায়িত শিল্পপার্ক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে ভেজাল প্রতিরোধ ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে এ শিল্প দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কবির আহমেদ চৌধুরী বলেন, দেশের মোট আগর ও আতর উৎপাদনের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই বড়লেখাকে কেন্দ্র করে। তাঁর দাবি, এ শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
সঠিক উদ্যোগে হতে পারে বড় রপ্তানি খাত
বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক সুগন্ধির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার এখনই উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তা, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, আধুনিক প্যাকেজিং এবং কার্যকর ব্র্যান্ডিংয়ের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে বড়লেখার আগর-আতর শিল্প পোশাকশিল্পের পর দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, দক্ষ কারিগর, অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ, জিআই স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা—এই পাঁচ শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বড়লেখার আগর-আতর শিল্প।
এখন প্রয়োজন সম্ভাবনাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো।
শতবর্ষের ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন ও বিপণন নিশ্চিত করা গেলে পাথারিয়ার পাদদেশের এই সুগন্ধির সাম্রাজ্য শুধু বড়লেখার পরিচয় নয়, বরং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র সুগন্ধি ব্র্যান্ড হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।




আগরের গাছ থেকে নানা প্রক্রিয়া শেষে আতর তৈরির চিত্র
