রাজবাড়ী প্রতিনিধি: রাজবাড়ী শহরের বড় বাজার এলাকায় ব্যবসায়িক অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জাকিয়া সুলতানা নামে এক নারী উদ্যোক্তাকে প্রকাশ্যে ধাওয়া ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার রাজবাড়ী সদর উপজেলার পান্না চত্বর ও বড় বাজারের উত্তরা ব্যাংক রাজবাড়ী শাখার সামনের রাস্তায় ঘটা এই লাঞ্ছনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও বিতর্কের সৃষ্টি করে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া তথ্য ও পুলিশের স্পষ্টীকরণ ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পেজ ও আইডি থেকে দাবি করা হতে থাকে যে, লাঞ্ছিত নারী একজন সরকারি কর্মকর্তা বা ম্যাজিস্ট্রেট, যিনি ভোক্তা অধিকারের অভিযানে গিয়ে অসাদুপায় অবলম্বনকারী ব্যবসায়ীদের হামলার শিকার হয়েছেন। তবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এই তথ্য পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে।
রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ জানান, “অনলাইনে ছড়ানো বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুয়া। আক্রান্ত জাকিয়া সুলতানা কোনো ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মকর্তা নন; তিনি রাজবাড়ী বড় বাজারের ‘আস্থা পোশাক শিল্প’ নামক প্রতিষ্ঠানের একজন স্থানীয় স্বত্বাধিকারী ও কাপড় ব্যবসায়ী।”
ঘটনার সূত্রপাত ও নেপথ্য দ্বন্দ্ব পুলিশ ও বাজার সূত্রে জানা যায়, দ্বন্দের মূল কারণ জাকিয়া সুলতানা ও তার প্রতিষ্ঠানের সাবেক এক নারী কর্মচারীর ব্যবসায়িক হিসাব ও দোকান দেওয়াকে কেন্দ্র করে। উক্ত কর্মচারী চাকরি ছেড়ে দিয়ে একই কাপড় বাজারে নিজের নতুন একটি দোকান শুরু করেন। অভিযোগ ওঠে, সাবেক এই কর্মচারীর নতুন দোকানটি বন্ধ করার জন্য জাকিয়া সুলতানা বাজার কমিটির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।
একপর্যায়ে জাকিয়া সুলতানা উক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে বাজার কল্যাণ সমিতিতে লিখিত আবেদন জমা দেন। বিষয়টিকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাজার কমিটির নেতাদের সঙ্গে তাঁর দফায় দফায় তর্ক-বিতর্ক ও তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
বিক্ষোভ মিছিল ও হামলার চিত্র হুমকি ও অসদাচরণের প্রতিবাদে জাকিয়া সুলতানার নেতৃত্বে প্রায় ৪০-৫০ জন নারী কর্মীকে নিয়ে শহরজুড়ে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি পান্না চত্বর থেকে শুরু হয়ে ১ নম্বর রেলগেট প্রদক্ষিণ করে বড় বাজারের কাদেরিয়া সুপার মার্কেটে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে জাকিয়া সুলতানা কাদেরিয়া মার্কেটে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।
এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মার্কেটের অন্যান্য দোকান মালিক ও কর্মচারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে উত্তেজনার পারদ চড়লে ব্যবসায়ীরা সংঘবদ্ধ হয়ে জাকিয়া সুলতানাকে ধাওয়া করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, রাজবাড়ী বড় বাজারের উত্তরা ব্যাংকের সামনে রাস্তায় কয়েকজন যুবক ওই নারীকে ঘিরে ফেলে ধাওয়া দেন, গালিগালাজ করেন এবং এক যুবক তাকে পেছন থেকে সজোরে লাথি মারেন।
থানায় উদ্ধার ও পারস্পরিক আপস-মীমাংসা মারধরের ঘটনার খবর পেয়ে রাজবাড়ী সদর থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ জাকিয়া সুলতানাকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য থানায় নিয়ে যায়। ঘটনার পর কাদেরিয়া মার্কেটের ব্যবসায়ীরাও দোকানপাট বন্ধ করে জাকিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মিছিল নিয়ে থানায় হাজির হন।
পরবর্তীতে থানায় উভয় পক্ষের লিখিত ও মৌখিক অভিযোগের পরিপ্রক্ষিতে রাজবাড়ী সদর থানার মধ্যস্থতায় এক বৈঠকের আয়োজন করা হয়। থানায় দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে বিষয়টি পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে আপস-মীমাংসা করে নেন। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, আপস-মীমাংসার পর বর্তমানে বড় বাজার এলাকার ব্যবসায়িক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।
