নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার; পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের ছাতকের আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যবসায়ী হাজী স্বপন মিয়া (৫২)কে রাজধানী ঢাকার রমনা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নাশকতার একটি মামলায় তদন্তে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে রমনা এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সুনামগঞ্জ আদালতে পাঠানো হয়েছে।
হাজী স্বপন মিয়া দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সারপিন নগর গ্রামের মৃত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নানের ছেলে। বর্তমানে তিনি ছাতক পৌর শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ছোরাবনগর আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকায় অভিযান
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় ছাতক থানার একটি দল ঢাকায় অভিযান পরিচালনা করে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে হাজী স্বপনের অবস্থান শনাক্ত করার পর রমনা থানা এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পরে একটি আবাসিক হোটেল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ছাতক থানার মামলা নম্বর-২৮, তারিখ ২২ জুলাই ২০২৫, The Special Power Act-1974-এর ১৫(৩)/২৫-ডি ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। ওই মামলায় হাজী স্বপন মিয়াকে তদন্তে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গণধোলাইয়ের পর পুলিশ হেফাজত, এরপর বিতর্ক
হাজী স্বপনের ঢাকায় গ্রেপ্তারের আগে গত রোববার রাতে ছাতক শহরের তাহির প্লাজার সামনে তাকে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেন—এমন অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ওই এলাকায় আসার পর কয়েকজন তাকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধর করেন। খবর পেয়ে ছাতক থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে হেফাজতে নেয়।
পরে আহত অবস্থায় তাকে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য পুলিশি নিরাপত্তায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এরপর হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়।
ওসি প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ
হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের প্রতিবাদে সোমবার রাতে ছাতক পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। সমাবেশ থেকে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে আইনের প্রয়োগে ভিন্নতা তৈরি হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
সমাবেশে ছাতক পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর জসিমউদ্দীন সুমেন, পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন সালমান, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বাকি বিল্লাহসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বক্তব্য দেন।
পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন
তবে হাজী স্বপন মিয়াকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমান। পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় হাজী স্বপনের অবস্থান শনাক্ত করা হয় এবং ঢাকার রমনা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে তাকে কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও ওসি অস্বীকার করেছেন।
ব্যবসায়িক বিরোধ নিয়েও আলোচনা
এদিকে হাজী স্বপন মিয়া ও পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন সুমেনের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের কথাও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে।
বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও বিরোধের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
তবে এই বিরোধের সঙ্গে হাজী স্বপনকে মারধর, পুলিশ হেফাজতে নেওয়া কিংবা পরবর্তী সময়ে ঢাকায় গ্রেপ্তারের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকেও বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন অভিযোগ নিয়েও আলোচনা
স্থানীয়দের কেউ কেউ হাজী স্বপনের বিরুদ্ধে বালু ব্যবসা, নদী থেকে বালু উত্তোলন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো মামলা বা তদন্ত রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পৃথকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হাজী স্বপনের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গ্রেপ্তার ঘিরে নানা প্রশ্ন
গণধোলাইয়ের পর পুলিশ হেফাজতে নেওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসা, তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ, এ নিয়ে বিক্ষোভ এবং পরবর্তীতে ঢাকার রমনা এলাকা থেকে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার—পুরো ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে ছাতকে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত ও প্রচলিত আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে হাজী স্বপনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তাকে দোষী হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
