ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার পাগনা বড়বিল (বন্ধ) জলমহাল নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ইজারার শর্ত এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ইজারার প্রথম বছরেই মাছ আহরণের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইজারাদার ‘সোনারতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রকৃত মৎস্যজীবীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। যেকোনো সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কাও করছেন এলাকাবাসী।
জলমহালের মাছ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিধান থাকা সত্ত্বেও জাল, দড়ি ও মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে বিলে মাছ আহরণের প্রস্তুতি চলছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী ‘হরিনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নেতারা।
তাঁদের দাবি, এভাবে মাছ আহরণ করা হলে জলমহালের মৎস্যসম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।
এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে গত ২৯ অক্টোবর সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন হরিনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন। অভিযোগের অনুলিপি ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এবং ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছেও পাঠানো হয়েছে।
ইজারা ও আদালতের নির্দেশনা নিয়ে বিরোধ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পাগনা বড়বিল জলমহালটি ১৪৩৩ থেকে ১৪৩৫ বাংলা সন পর্যন্ত তিন বছরের জন্য ইজারা পায় সোনারতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড। তবে এই ইজারার বৈধতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলে হরিনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন, যার নম্বর ১১৫৬৩/২০২৬।
অভিযোগকারীর দাবি, রিটের শুনানি শেষে গত ১৫ সেপ্টেম্বর আদালত এ বিষয়ে রুল জারি করেছেন। ফলে জলমহালটির ইজারা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আইনি বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৯ এবং ইজারার দ্বিপক্ষীয় চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মৎস্যসম্পদের বংশবৃদ্ধি, সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে প্রথম ও দ্বিতীয় বছরে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ রেখে মাছ সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। অথচ ইজারার প্রথম বছরেই বিলে মাছ ধরার জন্য জাল, লোকজন ও সরঞ্জাম একত্রিত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যা সরকারি নীতিমালা ও ইজারার শর্তের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
প্রকৃত মৎস্যজীবীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ
হরিনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের সমিতির সদস্যরা দরিদ্র ও পেশাদার মৎস্যজীবী। তাঁরা বংশপরম্পরায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু জলমহাল ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত মৎস্যজীবীদের স্বার্থ উপেক্ষা করে প্রভাবশালী একটি মহল ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইজারার প্রথম বছরেই যদি অবৈধভাবে মাছ আহরণ করা হয়, তাহলে মাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হবে। জলমহালের মৎস্যসম্পদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। আমরা চাই, প্রশাসন সরেজমিন তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করুক এবং সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।’
অভিযোগকারীদের দাবি, ‘জাল যার, জলা তার’—প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই নীতি পাগনা বড়বিলের ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। রাজনৈতিক প্রভাব ও সমবায় সমিতির সদস্য পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ
জলমহালটির ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে বিগত সরকারের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত [এখানে নির্দিষ্ট কোনো নেতার নাম বা পদবি থাকলে দিন] এবং কয়েকজন ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে জলমহাল ইজারা ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এলাকার একাধিক ব্যক্তি এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। দক্ষিণ সাদারাই গ্রামের আব্দুর রউফ, আব্দুল কাইয়ুম, সালিক মিয়া, আছকির আলী, পাগনার পাড় গ্রামের নাছির উদ্দিন, নুরুল আমিন, আলীম খা, ছাতারপইয়ের আনছার আলী, ছামির আলী এবং জালিয়া গ্রামের মিনার মিয়াসহ অর্ধশতাধিক লোকজনের দাবি, সোনারতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি নামেমাত্র একটি সমবায় সমিতি; এর সদস্যদের কেউই প্রকৃত মৎস্যজীবী নন।
তাঁদের অভিযোগ, সমিতির সভাপতি পেশায় দিনমজুর বা কৃষক। বাকি সদস্যরাও ভিন্ন পেশার সঙ্গে জড়িত। এমনকি মৃত ব্যক্তিও এই সমিতির সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন—যা উপজেলা সমবায় দপ্তরের তদন্তেও উঠে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাগনা বড়বিলের ইজারা ও মালিকানা-সংশ্লিষ্ট বিরোধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও আইনি পর্যায়ে আলোচনা চলছে। বিষয়টি স্থানীয় আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ফলে জলমহালটির নিয়ন্ত্রণ, ইজারার বৈধতা এবং মাছ আহরণের অধিকার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।
প্রশাসনের বক্তব্য
ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন পিপিএম অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘মৎস্য আইন ও নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক বিলের মাছ আহরণের কোনো সুযোগ নেই। আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেউ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহি উদ্দিন বলেন, ‘পাগনা বড়বিল নিয়ে বিরোধের বিষয়ে দুই পক্ষকে নিয়ে আমার কার্যালয়ে আলোচনা হয়েছে। মৎস্য আইন, সরকারি নীতিমালা ও ইজারার শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যত বড় প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইন লঙ্ঘন করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
স্থানীয়দের দাবি, পাগনা বড়বিলের বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তাই কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে ইজারার বৈধতা, সমবায় সমিতির প্রকৃত সদস্যদের পরিচয়, আদালতের নির্দেশনা এবং মাছ আহরণের প্রস্তুতির বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। সরকারি জলমহাল রক্ষা, মৎস্যসম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন এলাকাবাসী।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
