নেট-ঘাট তুলে নেওয়ার অভিযোগে আওয়ামী লীগের তিন নেতাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে চার দপ্তরে লিখিত অভিযোগ
১৭ বছর ধরে জলমহাল ভোগদখলের অভিযোগ; ইজারার শর্ত ভঙ্গ ও প্রকৃত মৎস্যজীবীদের বঞ্চিত করার দাবি, ক্ষতিপূরণ ও আইনগত ব্যবস্থা চেয়েছেন ভুক্তভোগী
আনোয়ার হোসেন রনি, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় পাগনা বড়বিল জলমহালসহ বিভিন্ন জলাশয়ে মৎস্য আহরণ ও দখলকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। মাছ চাষের জন্য নেট দিয়ে ঘেরা জলাশয়ের দুই পাশের নেট-ঘাট জোরপূর্বক তুলে নেওয়া এবং এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার উৎপাদিত মাছ, সংরক্ষিত মাছ ও মাছের পোনা ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে সোনারতরী মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মিরাস আলীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় সোনারতরী মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মিরাস আলী, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা লুৎফুর রহমান এবং ছাতক উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আলী আসকরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের ছাতরপাই গ্রামের বাসিন্দা আনছার মিয়া।
গত ২৯ অক্টোবর তিনি সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক, ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে পৃথকভাবে অভিযোগ দায়ের করেন।
লিখিত অভিযোগে আনছার মিয়া উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট মিরাস আলী, লুৎফুর রহমান ও আলী আসকরের নেতৃত্বে একদল লোক তাঁর নেট দিয়ে বেষ্টিত মৎস্য উৎপাদনকেন্দ্রের দুই পাশের নেট-ঘাট জোরপূর্বক খুলে নিয়ে যায়।
এতে জলাশয়ে থাকা প্রায় ১০ লাখ টাকার উৎপাদিত মাছ, সংরক্ষিত মাছ ও মাছের পোনা বিভিন্ন জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তিনি, তাঁর সহযোগী ও অংশীদাররা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সোনারতরী মৎস্যজীবী সমিতির সদস্যদের অনেকেই প্রকৃত মৎস্যজীবী নন। আনছার মিয়ার দাবি, গত প্রায় ১৭ বছর ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পাগনা বড়বিলসহ বিভিন্ন জলমহাল অন্যায়ভাবে ভোগদখল করে আসছে। এ সময় জলমহাল ইজারার শর্ত ও চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আনছার মিয়ার অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। জলমহাল ব্যবস্থাপনার নামে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। এতে সাধারণ মৎস্যজীবীরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মাছ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত অংশীদাররাও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
অভিযোগকারী দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট জলমহালগুলো সরেজমিনে তদন্ত করা হলে অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটিত হবে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়ভাবে জলমহাল ইজারা, মৎস্য উৎপাদন ও প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে এ অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনায় ইজারার শর্ত কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীরা কতটা উপকৃত হচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দায়ের করা পৃথক দুটি অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহি উদ্দিন। তিনি বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
জলমহাল কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি সরকারি সম্পদ। তাই রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা পেশিশক্তির মাধ্যমে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হলে তা শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। এ কারণে অভিযোগের প্রতিটি বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী আনছার মিয়া।
সংবাদ প্রকাশ পর্যন্ত অভিযুক্ত মিরাস আলী, লুৎফুর রহমান ও আলী আসকরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
