বিশেষ প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত মামলায় আদালতের মাধ্যমে নিলামে বিক্রি হওয়া জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। একদিকে অর্থঋণ আদালতের নিলামে জমি কেনা ও নিজের নামে নামজারি সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছেন ক্রেতা শেখ আহমেদ আফজাল। অন্যদিকে, জমির মূল মালিক সিরাজ উল্লাহর উত্তরাধিকারীদের দাবি, জমির মালিকানা নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান এবং স্থগিতাদেশ ও নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকা সত্ত্বেও সেখানে নির্মাণ ও সংস্কারকাজ চালানো হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শ্রীমঙ্গলে এক সংবাদ সম্মেলনে উত্তরাধিকারীদের পক্ষে আমমোক্তারপ্রাপ্ত মো. জলিল মাহমুদ এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় তিনি জমির মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
নিলাম ও জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ
সংবাদ সম্মেলনে জলিল মাহমুদ দাবি করেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলার আলিশারকুল মৌজার সাতগাঁও চৌমুহনা-সংলগ্ন প্রায় ৫৮ শতক জমি সিরাজ উল্লাহর মূল উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি। তাঁর অভিযোগ, ১৯৮২ সালে আজিজ মিয়া নামের এক ব্যক্তি ভুয়া দলিলের মাধ্যমে জমিটি হস্তান্তরের চেষ্টা করেন। পরবর্তী সময়ে জমিটি একাধিকবার হাতবদল হয়ে ব্যাংকের ঋণ ও বন্ধকসংক্রান্ত মামলায় জড়িয়ে পড়ে।
উত্তরাধিকারীদের দাবি, জমির মালিকানা নিয়ে তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং এ-সংক্রান্ত মামলায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, আদালতের আদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় জমিতে অবস্থিত পুরোনো পেট্রোল পাম্পে নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন, আলোকসজ্জা ও সংস্কারকাজ করা হচ্ছে।
তবে উচ্চ আদালতের আদেশের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট জমির ওপর তার প্রযোজ্যতা আদালতের আদেশের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ক্রেতার দাবি, আদালতের নিলামে কেনা সম্পত্তি
অন্যদিকে, শেখ মো. আফজাল হোসেনের দাবি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের বকেয়া ঋণ আদায়ের জন্য দায়ের করা অর্থঋণ মামলা নং ৩১/২০২১-এর আওতায় আদালতের নিলামে তিনি সম্পত্তিটি সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ক্রয় করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের অনুমোদন ও নিলাম বিক্রয় সনদের ভিত্তিতে সম্পত্তি কেনার পর মালিকানা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
সরবরাহ করা নিলাম বিক্রয় সনদের তথ্য অনুযায়ী, অর্থঋণ আদালত, মৌলভীবাজারের সংশ্লিষ্ট মামলায় ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ তারিখে নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেখ আহমেদ আফজাল ক্রেতা হিসেবে উল্লেখ রয়েছেন। বিক্রয় সনদে আলিশারকুল মৌজার আরএস দাগ নং ১৭৮৮-এর ৫৮ শতক জমিসহ ভারাউড়া মৌজার আরও ৬০ শতক জমির বিবরণ রয়েছে। সব মিলিয়ে বিক্রিত জমির পরিমাণ ১১৮ শতক বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঙ্গে মেসার্স সম্রাট ফিলিং স্টেশনের কথাও রয়েছে।
নামজারি ও ভূমি অফিসের নথিতে যা রয়েছে
সরবরাহ করা ভূমি-সংক্রান্ত কাগজপত্রে দেখা যায়, আলিশারকুল মৌজার আরএস খতিয়ান নং ১৪১৪ এবং আরএস দাগ নং ১৭৮৮-এর ৫৭ শতক জমি শেখ আহমেদ আফজালের নামে নামজারি করা হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, মিউটেশন মামলা নং ৫৬৯৩(IX-I)/২০২৩-২৪-এর আদেশের তারিখ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। পরবর্তী সময়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে DCR নং DCR25588303405696 ইস্যু করা হয়। সরবরাহ করা মিউটেশন খতিয়ানে খতিয়ান নং ২০২৬-১০০০২২ উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের একটি ট্রেড লাইসেন্সে ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে মেসার্স সম্রাট ফিলিং স্টেশনের মালিক হিসেবে শেখ/আহমেদ মোহাম্মদ আফজালের নাম রয়েছে। লাইসেন্সটিতে ব্যবসার ধরন হিসেবে জ্বালানি তেলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ট্রেড লাইসেন্স, নামজারি খতিয়ান, DCR কিংবা নিলাম বিক্রয় সনদ—কোনো একক নথিই বিরোধপূর্ণ জমির ওপর উত্থাপিত সব দাবি বা উচ্চ আদালতের আদেশের কার্যকারিতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ, জমির মূল মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং নিলাম ও নামজারির নথি একসঙ্গে যাচাই করা জরুরি।
ভূমি প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্য
উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার অভিযোগের মধ্যেও কীভাবে নামজারি সম্পন্ন হয়েছে—এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিনহাজুল ইসলামের বক্তব্য, নামজারিটি পূর্ববর্তী কর্মকর্তা সম্পন্ন করেছেন। পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র ও আদালতের আদেশ পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে আইনানুগ সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের সত্যতা ও আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে নথি ও আদালতের আদেশের ওপর
একদিকে অর্থঋণ আদালতের নিলাম, বিক্রয় সনদ ও নামজারির নথি; অন্যদিকে মূল মালিকের উত্তরাধিকারীদের মালিকানা দাবি এবং উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও নিষেধাজ্ঞা থাকার অভিযোগ—সব মিলিয়ে জমিটি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এ বিরোধ নিষ্পত্তিতে উচ্চ আদালতের আদেশের প্রকৃত ভাষা ও কার্যকারিতা, আদেশটি সংশ্লিষ্ট জমি ও পক্ষগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, নিলাম কার্যক্রমের সময় কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল কি না এবং নামজারির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং আদালতের আদেশের আলোকে আইনানুগ সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও চৌমুহনা-সংলগ্ন এই জমি ও পেট্রোল পাম্পের মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি হতে পারে।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
