যা কিছু রটে, তার সবটাই সত্য নয়; তেমনি যা কিছু প্রকাশ করা যায়, তার সবটাই প্রকাশ করা উচিত নয়।
সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ সংগ্রহ, ছবি তোলা, বক্তব্য ধারণ কিংবা কোনো ঘটনা লিখে প্রকাশ করার নাম নয়। সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা, যার মূল ভিত্তি সত্য, নিরপেক্ষতা, অনুসন্ধান, মানবিকতা ও জনস্বার্থ। একজন সাংবাদিকের হাতে থাকা কলম যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনি অসতর্ক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিংবা যাচাইহীন সংবাদ একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন, পরিবার, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
একুশ শতকে প্রযুক্তির বিস্তার সাংবাদিকতাকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে এসেছে। এখন একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থাকলেই মুহূর্তের মধ্যে কোনো ঘটনা হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের এই সহজলভ্যতা সাংবাদিকতার মান, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার নিশ্চয়তা দেয়নি। বরং কোথাও কোথাও সংবাদ ও অপসংবাদের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পেশাদার সাংবাদিকতার পাশাপাশি এমন এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে সংবাদ প্রকাশের চেয়ে পরিচয়, প্রভাব, ব্যক্তিস্বার্থ, অনুসারী বৃদ্ধি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় থাকার প্রবণতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ প্রশ্ন শুধু মফস্বল সাংবাদিকতার নয়; শহর, মহানগর, জাতীয় সংবাদমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—বিভিন্ন স্তরেই এ ধরনের সংকটের প্রকাশ দেখা যায়। তবে স্থানভেদে এর ধরন ও মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
সংবাদ নাকি কপি-পেস্ট—সাংবাদিকতার কাজ কোনটি?
বর্তমানে সংবাদমাধ্যমের একটি অংশে প্রেস বিজ্ঞপ্তিনির্ভরতা ও কপি-পেস্টের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন, ব্যক্তি কিংবা প্রভাবশালী মহল একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠালেই সেটি যাচাই-বাছাই ছাড়াই সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বক্তব্যের অপর পক্ষের মতামত নেওয়া হয় না, ঘটনার বাস্তবতা যাচাই করা হয় না, এমনকি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত তথ্যের সত্যতা সম্পর্কেও কোনো অনুসন্ধান থাকে না।
অথচ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি নিজেই সংবাদ নয়; এটি একটি তথ্যসূত্র মাত্র। সেটিকে সংবাদে রূপ দিতে হলে তথ্য যাচাই, প্রাসঙ্গিকতা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়।
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজের পক্ষে যে বক্তব্য দিয়েছে, সেটিই সংবাদমাধ্যমের চূড়ান্ত বক্তব্য হয়ে যেতে পারে না। সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো বক্তব্যটি যাচাই করা, প্রয়োজন হলে প্রশ্ন তোলা এবং পাঠকের সামনে ঘটনার একাধিক দিক তুলে ধরা।
একটি সংবাদমাধ্যম যদি কেবল অন্যের পাঠানো বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেখানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জায়গা সংকুচিত হয়। সংবাদকক্ষ তখন জনস্বার্থের তথ্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে অন্যের বক্তব্য প্রচারের ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
মামলা হলেই অপরাধী নয়, সংবাদেও থাকতে হবে সংযম
সাংবাদিকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো মামলা, অভিযোগ কিংবা বিরোধকে কেন্দ্র করে কাউকে আগেভাগেই অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, অভিযোগ দায়ের হয়েছে কিংবা কেউ তাঁকে অপরাধী বলে দাবি করেছেন—এসব তথ্য সংবাদ হতে পারে। কিন্তু অভিযোগ দায়ের হওয়া আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
কোনো মামলার বাদীর বক্তব্য প্রকাশ করা হলে বিবাদী বা অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ। তদন্তের অবস্থা, আদালতের পর্যবেক্ষণ, প্রাসঙ্গিক নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা না করে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করা ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
আবার বিচারাধীন মামলা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না—এমন ধারণাও সঠিক নয়। সংবাদপত্রের আচরণবিধিতে বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশের দায়িত্বের কথা রয়েছে; তবে চূড়ান্ত রায়ের আগে এমন মন্তব্য বা মতামত প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
অতএব, সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিচারাধীন বিষয়ে দায়িত্বশীলতা ও সংযমও অপরিহার্য।
অন্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেই তা সত্য হয়ে যায় না
একটি সংবাদমাধ্যম কোনো তথ্য প্রকাশ করেছে বলেই অন্য সংবাদমাধ্যমের জন্য সেটি যাচাই ছাড়াই পুনঃপ্রকাশের বৈধতা তৈরি হয় না। বরং অন্যের প্রকাশিত তথ্য পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রেও তথ্যের সত্যতা, উৎস ও প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা প্রয়োজন।
একটি ভুল তথ্য যখন একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তখন পাঠকের কাছে সেটি সত্য বলে মনে হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অথচ ভুল তথ্যের পুনরাবৃত্তি তাকে সত্যে পরিণত করে না।
সংবাদ প্রকাশের আগে সাংবাদিকের নিজের কাছে প্রশ্ন থাকা উচিত—তথ্যটির উৎস কী? এর পক্ষে কী প্রমাণ আছে? সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি? সংবাদটি জনস্বার্থে প্রয়োজনীয়, নাকি কারও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তৈরি করা হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া গেলে সংবাদ প্রকাশ স্থগিত রাখা দায়িত্বহীনতা নয়; বরং পেশাগত সতর্কতা।
সংবাদ কি ব্যক্তিগত প্রতিশোধের হাতিয়ার?
সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা সামাজিক শত্রুতাকে সংবাদে রূপ দেওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেওয়া, তাঁর ছবি বা পরিবারের ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো, একপক্ষের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জনমত তৈরি করা কিংবা কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে ধারাবাহিক পোস্ট ও সংবাদ প্রকাশ—এসব কর্মকাণ্ড সাংবাদিকতার স্বাধীনতার স্বাভাবিক ব্যবহার নয়।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই অনুসন্ধান ও প্রকাশের বিষয় হতে পারে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের উদ্দেশ্য যদি সত্য উদ্ঘাটন না হয়ে কাউকে ভয় দেখানো, চাপে রাখা কিংবা ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়, তাহলে সেটি সাংবাদিকতার নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, পারিবারিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করে কাউকে হেয় করার আগে সাংবাদিককে ভাবতে হবে—এই তথ্য প্রকাশের বাস্তব জনস্বার্থ কী? তথ্যটি কি যাচাই করা? প্রকাশের ফলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারের সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কি না?
একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব অন্যায়ের তথ্য প্রকাশ করা, কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে অস্ত্র বানানো নয়।
ভয়ভীতি, প্রভাব বিস্তার ও সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার
কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিক পরিচয়কে এমনভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ পাওয়া যায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। কয়েকজন ব্যক্তি একত্রে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী কিংবা অন্য কোনো পেশাগত পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে চাপের মুখে ফেলেন—এমন অভিযোগও বিভিন্ন এলাকায় আলোচনায় আসে।
কাউকে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখানো, তাঁর বক্তব্য না নিয়েই তাঁকে অভিযুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা, ব্যক্তিগত বিরোধে সংবাদমাধ্যমের নাম ব্যবহার করা কিংবা সংবাদ প্রকাশ ও প্রকাশ না করার বিনিময়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
এসব অভিযোগের সত্যতা নির্দিষ্ট ঘটনা ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। তবে কোনো পরিচয়ই কাউকে ভয় দেখানো, হয়রানি করা বা বেআইনি সুবিধা আদায়ের অধিকার দেয় না।
সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতার আসন নয়, কোনো ব্যক্তিগত বাহিনীও নয়। সাংবাদিকের পরিচয় তাঁকে প্রশ্ন করার অধিকার দেয়; অন্যের ওপর অন্যায়ভাবে কর্তৃত্ব করার অধিকার দেয় না।
ক্ষমতাবানদের মুখপাত্র, নাকি জনগণের কণ্ঠ?
সাংবাদিকতার একটি মৌলিক দায়িত্ব হলো ক্ষমতাসীন, প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তথ্য তুলে ধরা। কিন্তু কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম যদি কেবল ক্ষমতাবানদের বক্তব্য প্রকাশ করে, তাঁদের স্বার্থের বাইরে যেতে না চায় কিংবা জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে চলে, তাহলে সাংবাদিকতার স্বাধীন ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কখনো দেখা যায়, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বক্তব্য বা কর্মসূচি নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে, অথচ এলাকার হাসপাতালের সংকট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, সড়কের দুরবস্থা, জনদুর্ভোগ, পরিবেশ ধ্বংস কিংবা সাধারণ মানুষের অধিকারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংবাদমাধ্যমে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।
আবার এর বিপরীত প্রবণতাও অনৈতিক। কোনো সাংবাদিক যদি ব্যক্তিগত বিরোধ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একতরফা সংবাদ প্রকাশ করেন, সেটিও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মানে কাউকে অকারণে আক্রমণ করার স্বাধীনতা নয়; আবার ক্ষমতাবানদের অসন্তুষ্টির ভয়ে সত্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকার নামও নিরপেক্ষতা নয়।
সাংবাদিকের অবস্থান হওয়া উচিত তথ্যের পক্ষে, ন্যায়সংগত প্রশ্নের পক্ষে এবং জনস্বার্থের পক্ষে।
সংবাদমাধ্যমের মালিক ও সম্পাদকের দায় কোথায়?
সাংবাদিকতার নৈতিক সংকটের দায় শুধু মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদকের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক এবং সংবাদ প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায় রয়েছে।
কোনো সংবাদমাধ্যম কাকে নিয়োগ দিচ্ছে, কার হাতে পরিচয়পত্র তুলে দিচ্ছে, প্রতিবেদকের কাজ কীভাবে মূল্যায়ন করছে, সংবাদ প্রকাশের আগে যাচাই-বাছাই হচ্ছে কি না এবং অভিযোগ উঠলে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে—এসব বিষয় প্রতিষ্ঠানের পেশাগত মান নির্ধারণ করে।
যদি কোনো সংবাদমাধ্যম কেবল অনুসারী, লাইক, মন্তব্য, প্রচার ও আর্থিক সুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেখানে সাংবাদিকতার মানের চেয়ে বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
একটি সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু সংবাদ প্রকাশ করা নয়; ভুল সংবাদ সংশোধন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির বক্তব্য প্রকাশ, প্রতিবেদকের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব।
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪-এর ১১ ধারায় সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার স্বাধীনতা রক্ষা এবং মান উন্নয়নের পাশাপাশি সাংবাদিকদের উচ্চ পেশাগত মান বজায় রাখার জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। একই আইনের ১২ ধারায় পেশাগত অসদাচরণ বা সাংবাদিকতার আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে সতর্ক, তিরস্কার বা নিন্দা জানানোর ক্ষমতার বিধান রয়েছে; তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিতে হয়। <Cite refs={[“turn921297search0″,”turn921297search8”]}/>
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের প্রকাশিত আচরণবিধিতেও তথ্যের সত্যতা ও নির্ভুলতা যাচাই, গুজব ও অসমর্থিত তথ্য যাচাই ছাড়া প্রকাশ না করা, বিদ্বেষমূলক সংবাদ পরিহার, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং ভুল সংবাদ সংশোধনের মতো নীতির উল্লেখ রয়েছে। <Cite refs={[“turn921297search1″,”turn921297search5”]}/>
অর্থাৎ দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নীতিমালা নতুন কোনো দাবি নয়; বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত ভিত্তি রয়েছে।
সংবাদ প্রকাশের আগে কয়েকটি প্রশ্ন জরুরি
একটি সংবাদ প্রকাশের আগে সাংবাদিক ও সম্পাদকের অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করা প্রয়োজন—
১. তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য?
২. তথ্যের পক্ষে নথি, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য কিংবা অন্য কোনো যাচাইযোগ্য ভিত্তি আছে কি?
৩. সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে কি?
৪. শিরোনাম ও প্রতিবেদনের ভাষা তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি?
৫. সংবাদটি জনস্বার্থে প্রয়োজনীয়, নাকি কারও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে?
৬. প্রকাশিত তথ্যের কারণে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি বা তাঁর পরিবার অযথা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কি?
৭. ভুল প্রমাণিত হলে সংবাদমাধ্যমটি সংশোধন বা প্রতিবাদ প্রকাশে প্রস্তুত কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে না নিয়ে দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় নামা সাংবাদিকতার দায়িত্বশীল চর্চা নয়।
সংবাদ না করাও সাংবাদিকতা
সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ অনেক সময় উপেক্ষিত একটি দিক হলো—কখন সংবাদ প্রকাশ করতে হবে, আর কখন প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে হবে, সেই বিবেচনাবোধ।
কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি, অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি কিংবা প্রকাশের উদ্দেশ্য জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ক্ষতি করা—এমন পরিস্থিতিতে সংবাদ প্রকাশ স্থগিত রাখা বা প্রকাশ না করাই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ক্ষমতাবানদের চাপ, বিজ্ঞাপন হারানোর ভয়, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে সত্য সংবাদ গোপন রাখতে হবে। যাচাই করা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদ ইচ্ছাকৃতভাবে চেপে রাখা যেমন অনৈতিক, তেমনি যাচাইহীন অভিযোগ প্রকাশ করাও অনৈতিক।
এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারাই একজন প্রকৃত সাংবাদিকের পেশাগত পরিপক্বতা।
শেষ কথা: পরিচয় নয়, কাজই সাংবাদিকতার পরিচয়
সাংবাদিকতা একটি সম্মানজনক পেশা। এই পেশার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষ প্রতিকূলতা, ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সত্য প্রকাশ এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সাংবাদিকতার সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়লে তা নিয়ে কথা বলা জরুরি। সমালোচনা সাংবাদিকতাবিরোধী নয়; বরং পেশার মর্যাদা রক্ষার জন্য আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
সাংবাদিকের পরিচয়পত্র, পদবি, সংবাদমাধ্যমের নাম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা কাউকে প্রকৃত সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে না। সাংবাদিকতার পরিচয় প্রমাণিত হয় তাঁর কাজের মাধ্যমে—তথ্য যাচাইয়ে, নিরপেক্ষতায়, সাহসে, মানবিকতায় এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতায়।
সত্য প্রকাশের সাহস যেমন সাংবাদিকতার শক্তি, তেমনি যাচাইহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ক্ষতিকর সংবাদ প্রকাশ থেকে নিজেকে বিরত রাখার সংযমও সাংবাদিকতার শক্তি।
কারণ সব খবর সংবাদ নয়, সব অভিযোগ সত্য নয়, আর সবকিছু প্রকাশ করাই সাংবাদিকতা নয়। কখনো কখনো একটি সংবাদ প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তই হতে পারে সবচেয়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।(প্রথম পর্ব)
