‘জমজম’ মক্কা মোকাররমার হেরেম শরীফে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক কূপের নাম। এটি খানায়ে কাবার পূর্ব দিকে, হাজরে আসওয়াদের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত। কূপটির দূরত্ব প্রায় ৫৪ ফুট, গভীরতা সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৪৬ ফুট, মুখের ব্যাস প্রায় ৫ ফুট এবং পরিধি প্রায় ১৬ ফুট। ‘জমজম’ শব্দটি কিবতী ভাষা থেকে আগত, যার অর্থ ‘থেমে যাওয়া’। প্রায় চার হাজার বছর আগে এর উৎপত্তি ঘটে। পবিত্রতা, প্রাণময়তা ও রোগ নিরাময়ে এ পানির তুলনা পৃথিবীতে বিরল।
জমজম কূপের উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক পবিত্র ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাঁর স্ত্রী হযরত হাজেরা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম ও শিশু পুত্র হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাতু ওয়াসাল্লামকে মক্কার নির্জন মরুভূমিতে রেখে যান, সঙ্গে ছিল সামান্য পানি ও খেজুর। কিছুদিন পর পানি শেষ হয়ে গেলে হযরত হাজেরা (আ.) পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন। এ সময় আল্লাহর রহমতে শিশু ইসমাঈল (আ.)-এর পায়ের নিচ থেকে পানির ফোয়ারা প্রবাহিত হতে শুরু করে। পানির স্রোত থামানোর জন্য তিনি বালির বাঁধ দেন এবং বলেন “জমজম”—অর্থাৎ থেমে যাও। এভাবেই কূপটির নাম ‘জমজম’ হয়ে যায়।
হাদীসে বর্ণিত আছে, যদি হযরত হাজেরা (আ.) পানি আটকে না রাখতেন, তবে এটি একটি বিশাল নদীতে পরিণত হতো। জমজম কূপের আবির্ভাবের মাধ্যমে মক্কা নগরীতে মানব বসতির সূচনা ঘটে। তবে একসময় কূপটির চিহ্ন হারিয়ে যায়। পরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামা এর দাদা হযরত আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নের নির্দেশে কূপটি পুনরায় আবিষ্কার করেন। এরপর থেকে সকল গোত্রের মানুষ এর সংরক্ষণে সচেষ্ট হয়।
হজ মৌসুমে জমজমের পানি হাজীদের মধ্যে বিশেষভাবে বিতরণ করা হয়। এটি শুধু তৃষ্ণা নিবারণই করে না, বরং ক্ষুধা নিবারণ, হজমে সহায়তা এবং রোগ প্রতিরোধেও কার্যকর বলে বিবেচিত।
বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও বৈশিষ্ট্য:
আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, জমজমের পানিতে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান বিদ্যমান, যা মানবদেহের জন্য উপকারী। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম শরীরের ক্লান্তি দূর করতে সহায়তা করে এবং হাড় ও পেশির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এছাড়া জমজমের পানিতে ফ্লোরাইডের উপস্থিতি জীবাণু প্রতিরোধে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়, ফলে এ পানি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করলেও সহজে দূষিত হয় না। বিভিন্ন পরীক্ষায় এতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি খুবই কম বা অনুপস্থিত পাওয়া গেছে।
ভূগর্ভস্থ পানিবিজ্ঞানের (Hydrogeology) দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণা করা হয়, জমজম কূপটি একটি প্রাকৃতিক ভূগর্ভস্থ জলাধার ব্যবস্থার অংশ, যেখানে শিলা স্তরের ফাটল ও ছিদ্র দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে কূপে জমা হয়। এই প্রাকৃতিক পুনঃভরাট (recharge) ব্যবস্থার কারণেই কূপটি কখনো শুকিয়ে যায় না।
এছাড়া জমজমের পানির pH মান সাধারণত সামান্য ক্ষারীয় (alkaline), যা হজমে সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এ পানির রাসায়নিক গঠন প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে—যা গবেষকদের কাছে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭১ সালে এক মিশরীয় চিকিৎসক জমজমের পানির মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে সৌদি সরকার আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, এ পানি নিরাপদ ও বিশুদ্ধ এবং এতে উপকারী খনিজ উপাদান বিদ্যমান।
জমজম কূপ কখনো শুকিয়ে যায়নি। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হলেও এর পানির স্তরে কোনো ঘাটতি দেখা যায় না। হজ মৌসুমে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লিটার পানি ব্যবহৃত হয় এবং বিশ্বজুড়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তবুও আল্লাহর অশেষ রহমতে এর প্রবাহ অব্যাহত থাকে।
জমজমের পানির উৎস নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, এটি ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের মাধ্যমে সংযুক্ত। তবে নির্দিষ্ট কোনো একক উৎস নির্ধারণ করা এখনো সম্ভব হয়নি, যা এ কূপের একটি বিস্ময়কর দিক হিসেবে বিবেচিত।
ইসলামে জমজমের পানির বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। হাদীসে বর্ণিত আছে—“জমজমের পানি যে নিয়তে পান করা হয়, তা পূরণ হয়।” রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও এ পানি পান করতেন এবং সাহাবিদেরও পান করতে উৎসাহিত করতেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, “পৃথিবীর সর্বোত্তম পানি হলো জমজমের পানি।”
জমজমের পানি পান করার একটি বিশেষ আদব রয়েছে। কেবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে এবং দোয়া পড়ে পান করা উত্তম। দোয়াটি হলো—
“আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিয়ান, ওয়া রিযকান ওয়াসিয়ান, ওয়া শিফায়াম মিন কুল্লি দা’।”
অর্থাৎ—হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিযিক এবং সকল রোগ থেকে মুক্তি কামনা করছি।
উপসংহার: জমজম কূপ শুধু একটি পানির উৎস নয়; এটি ইসলামের ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও আল্লাহর বিশেষ নেয়ামতের এক অনন্য নিদর্শন। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এ পানির কিছু উপকারী দিক তুলে ধরলেও, এর প্রকৃত মর্যাদা ও বরকত নিহিত রয়েছে বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার গভীরে।
লেখক: শেখ সিরাজুল ইসলাম আল কাদেরী,অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) সিরাজনগর ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসা। শ্রীমঙ্গল,মৌলভীবাজার।
