আপনারা যারা মক্কার বর্তমান ইমামের ফতোয়া বা বক্তব্য উদ্ধৃত করে মীলাদুন্নবী ﷺ-এর বিরোধিতা করে পোস্ট করছেন, তাদের কাছে একটি বিষয় জানতে চাই—
মক্কার পূর্ববর্তী ইমাম ও বিশিষ্ট আলেমদের লিখিত কিতাবে মীলাদুন্নবী ﷺ সম্পর্কে কী লেখা আছে, সেটিও কি আপনারা দেখেছেন?
মক্কার বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ শাইখ আল্লামা আল-সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ইবনে আলাভী আল-মালিকী (রহ.) তাঁর পিতা শাইখ আলাভী ইবনে আব্বাস আল-মালিকী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে (১৩৯১ হিজরি) মক্কার মসজিদে হারামে শিক্ষকতা ও ইমামতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি ১৯৭১ থেকে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দ (১৪০৩ হিজরি) পর্যন্ত মসজিদে হারামে দরস ও ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তনের কারণে মসজিদে হারামে তাঁর সাধারণ দরস বন্ধ হয়ে গেলেও, ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি মক্কায় নিজস্ব দরসে হাদিস ও ফিকহের শিক্ষা দিয়ে যান।
মীলাদুন্নবী ﷺ সম্পর্কে তাঁর কিতাবে কী আছে?
মক্কার সাবেক ইমাম শাইখ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আলাভী আল-মালিকী আল-হাসানী (রহ.) তাঁর ‘সংশোধনীয় ভ্রান্ত ধারণাসমূহ’ গ্রন্থের শেষাংশে মীলাদুন্নবী ﷺ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
📖 মূল আরবি পিডিএফ:
https://drive.google.com/file/d/1gDilYXGzXAv6jrnUGTBwrNOrnUQmNdFl/view?usp=sharing
গ্রন্থটির ২৭২ পৃষ্ঠার মধ্যে ২৫৪ নম্বর পৃষ্ঠায় মীলাদুন্নবী ﷺ প্রসঙ্গে যে বক্তব্য রয়েছে, তার বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো—
অনুবাদ: নবীজির জন্মদিন (ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺ) সম্পর্কে সঠিক ধারণা
অনেক মানুষই নবীজির জন্মদিনের প্রকৃত সত্য ও তা উদযাপনের ধারণা বুঝতে ভুল করে। তারা এর এমন ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করায়, যার ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘ বিতর্ক ও আলোচনা তৈরি হয় এবং অযথা সময় নষ্ট করা হয়। এসব মূলত তাদের ভুল ধারণার ফল।
আমরা নবীজির জন্মদিন উপলক্ষে আগেও অনেক কিছু লিখেছি এবং রেডিও ও সর্বসাধারণের সামনে বারবার বক্তব্য দিয়েছি, যাতে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
আমরা আগে যা বলেছি, তা আবারও বলছি—
মীলাদুন্নবী ﷺ বা নবীজির আগমন উপলক্ষে একত্রিত হওয়া একটি স্বাভাবিক সামাজিক বিষয়—‘আদত’; এটি ইবাদতের কোনো অংশ নয়।
প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব ধারণা পোষণ করতে পারে। কারণ মানুষ তার নিজের কথা ও নিজের বিশ্বাসের সত্যতা সম্পর্কে জবাবদিহি করবে; অন্যের বিশ্বাসের জন্য নয়।
আমরা প্রতিটি মাহফিল ও অনুষ্ঠানে বলে আসছি—
এই ধরনের একত্রিত হওয়া একটি সাধারণ বিষয়; এটি কোনো ইবাদত নয়।
এরপরও কি অস্বীকৃতি বা আপত্তির কোনো সুযোগ থাকে?
মূল সমস্যা হলো সঠিক উপলব্ধির অভাব।
এ প্রসঙ্গে ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর একটি বক্তব্য উল্লেখযোগ্য—
«“আমি যখন কোনো আলেমের সঙ্গে বিতর্ক করেছি, আমিই বিজয়ী হয়েছি; কিন্তু যখন কোনো জাহেলের (মূর্খের) সঙ্গে বিতর্ক করেছি, সে আমার ওপর বিজয়ী হয়ে গেছে।”»
কারণ জ্ঞান অর্জনকারী সর্বনিম্ন স্তরের শিক্ষার্থীও বোঝে যে ‘সাধারণ অভ্যাসে পরিণত বিষয়’ (আদত) এবং ‘ইসলামী বিধান বা ইবাদত’—এই দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
যদি কেউ বলে, “এটি একটি শরিয়তসম্মত ইবাদত,” তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে—
“এর দলিল কী?”
আর যদি সে বলে, “এটি একটি সামাজিক অভ্যাস,” তাহলে তাকে বলা হবে—
“তুমি যা করতে চাও, করতে পারো।”
কারণ মূল বিপদ তখনই সৃষ্টি হয়, যখন মানুষ নিজের তৈরি কোনো বিষয়কে ইবাদতের রূপ দিয়ে দেয়। আমরা এ ধরনের বিষয় থেকেই মানুষকে সতর্ক করি।
সারকথা
মীলাদুন্নবী ﷺ উপলক্ষে সমবেত হওয়াকে তিনি ইবাদত নয়, বরং একটি ভালো ও গ্রহণযোগ্য সামাজিক অভ্যাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এর মধ্যে মানুষের জন্য কল্যাণ ও উপকারিতা রয়েছে বলে আলোচনা করেছেন।
এমনকি তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মক্কা ও মদিনায় সারা বছরজুড়েই নবীজির জন্মদিন উপলক্ষে এ ধরনের সমাবেশ আয়োজন করা হয়ে থাকে।
তাহলে প্রশ্ন হলো—
যিনি মক্কার মসজিদে হারামে ইমামতি ও শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেছেন, যিনি একজন মুহাদ্দিস ও ফকিহ হিসেবে পরিচিত এবং যাঁর লিখিত কিতাবে মীলাদুন্নবী ﷺ সম্পর্কে এমন বক্তব্য রয়েছে—
তাঁর বক্তব্যকে আমরা কি অন্তত পড়ব না?
বর্তমানের কোনো আলেমের বক্তব্য উদ্ধৃত করার আগে তাঁর পূর্ববর্তী আলেমদের লিখিত কিতাবও কি যাচাই করা উচিত নয়?
মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু একটি বিষয়কে ‘ভ্রান্ত’ বা ‘বিদআত’ বলার আগে সংশ্লিষ্ট আলেমদের বক্তব্য, তাঁদের কিতাব এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট—সবকিছু সামনে রেখে আলোচনা করাই তো ন্যায়সংগত।
তাই আসুন, ব্যক্তির বক্তব্য দিয়ে নয়—কিতাব খুলে, বক্তব্য পড়ে এবং দলিল যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিই।
মতভেদ হোক জ্ঞানের ভিত্তিতে, অজ্ঞতার ভিত্তিতে নয়।
লেখক: মুহাম্মদ আনিছুল ইসলাম আশরাফী,সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

