নিজস্ব প্রতিনিধি:;বাংলাদেশের আকাশে পবিত্র মহররম মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ায় ১৭ জুন ২০২৬ (বুধবার) থেকে শুরু হয়েছে ১৪৪৮ হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের নতুন হিজরি বছর ১৪৪৮-এর যাত্রা শুরু হলো। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২৬ জুন ২০২৬ (শুক্রবার) পালিত হবে পবিত্র আশুরা, অর্থাৎ ১০ মহররম।
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস হলো পবিত্র মহররম। এটি শুধু নতুন হিজরি বছরের সূচনাই নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতার পথে ফিরে আসার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। মহররম ইসলাম ধর্মে সম্মানিত চারটি পবিত্র মাসের অন্যতম, যার মর্যাদা পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘মহররম’ শব্দের অর্থ ‘সম্মানিত’ বা ‘নিষিদ্ধ’। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ ছিল। ফলে এ মাস শান্তি, সংযম ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
মহররম মাসের মাধ্যমেই শুরু হয় নতুন হিজরি বছর। হিজরি সনের সূচনা হয় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে। এই হিজরত শুধু স্থান পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল সত্য, ন্যায় ও ইসলামের আদর্শ প্রতিষ্ঠার এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
মহররম মাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিন হলো ১০ মহররম বা আশুরা। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সম্প্রদায় এ দিনকে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে পালন করে। সুন্নি মুসলমানদের কাছে আশুরা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের মুক্তির স্মৃতিবাহী দিন হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে কারবালার ঐতিহাসিক শাহাদাতের ঘটনাও এ দিনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
অন্যদিকে শিয়া মুসলমানদের কাছে আশুরা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে শোক, ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের প্রতীক। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের কারবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) অন্যায়, জুলুম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিয়ে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
মহররম আমাদের শিক্ষা দেয় অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে। একই সঙ্গে এ মাস মানুষকে পাপ থেকে বিরত থেকে সৎকর্ম, দান-সদকা, ইবাদত-বন্দেগি ও মানবসেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান জানায়। হাদিস শরিফে আশুরার রোজার বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (দ.) আশুরার রোজা পালনে উৎসাহিত করেছেন এবং ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন।
বর্তমান বিশ্বে যখন হিংসা, বিভেদ ও নৈতিক অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করছে, তখন পবিত্র মহররমের শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। আত্মসংযম, ত্যাগ, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনকে আলোকিত করাই হতে পারে এ মাসের প্রকৃত তাৎপর্য।
পবিত্র মহররম তাই শুধু একটি নতুন বছরের সূচনা নয়; এটি সত্য, ন্যায়, মানবতা ও আদর্শের পথে চলার অঙ্গীকার নবায়নের এক মহিমান্বিত আহ্বান।
মহররম ১৪৪৮ হিজরির গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ: • ১ মহররম ১৪৪৮ হিজরি — ১৭ জুন ২০২৬ (বুধবার)
• ৯ মহররম — ২৫ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার)
• ১০ মহররম (পবিত্র আশুরা) — ২৬ জুন ২০২৬ (শুক্রবার)
• ১১ মহররম — ২৭ জুন ২০২৬ (শনিবার)
