হোসাইন ইকবাল, স্পেন থেকে: স্পেনের উত্তর আফ্রিকান স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় জুলাইয়ের শেষ দিকে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন অভিবাসী প্রবেশের এক মাসেরও বেশি সময় পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও শহরের বিভিন্ন স্থানে এখনো বিপুলসংখ্যক অভিবাসী অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে আশ্রয়ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, স্থানীয় জনজীবন ও অর্থনীতির ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
৩০ ও ৩১ জুলাই মরক্কো থেকে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ সেউতায় অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করেছিল বলে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের হিসাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। মাত্র কয়েক দিনের এই গণপ্রবেশে শহরের সীমান্ত ও অভ্যর্থনা ব্যবস্থা চরম চাপে পড়ে। এরপর থেকে একদিকে অভিবাসীদের মরক্কোতে ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম চলছে, অন্যদিকে যারা এখনো শহরে অবস্থান করছেন, তাদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয় ও সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সেউতার বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো গণপ্রবেশের পর শহরে থেকে যাওয়া অভিবাসীদের ব্যবস্থাপনা। স্পেন সরকার তাদের শনাক্তকরণ, নথিভুক্তকরণ এবং আইনগতভাবে সম্ভব এমন ব্যক্তিদের মরক্কোতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।
৪ সেপ্টেম্বর স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শহরে এখনো থাকা হাজারো অভিবাসীর ব্যবস্থাপনায় সহায়তার জন্য START জরুরি সেবার সরঞ্জাম সেউতায় পাঠানো হয়েছে। এর মাধ্যমে অভিবাসীদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং মরক্কোতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অভিবাসীদের অস্থায়ীভাবে রাখার জন্য সেউতার বন্দরের কাছে নতুন একটি অভ্যর্থনা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় শতাধিক সেউতাবাসী বিক্ষোভে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীরা বন্দরের কাছে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা করেন এবং স্পেনের পতাকা হাতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
তাদের আশঙ্কা, বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের স্থাপনা শহরের স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইইউর সহায়তা চাইছে স্পেন
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও সহায়তা চাইছে স্পেন। ৪ সেপ্টেম্বর স্পেন সরকার জানায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি কারিগরি প্রতিনিধি দল আগামী সপ্তাহে সেউতা সফর করবে। অভিবাসন সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তার বিষয়ে তারা স্পেন ও সেউতা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবে।
এর আগে স্পেন সরকার সেউতার জন্য ১৬৮ মিলিয়ন ইউরোর জরুরি সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। স্থানীয় ব্যবসা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং কর্মসংস্থান রক্ষায়ও বিভিন্ন সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ের ঘটনা নিয়ে তদন্ত
অভিবাসন সংকটের পাশাপাশি সেউতার ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি তদন্তও এগিয়ে চলছে। স্পেনের জাতীয় পুলিশ ও গার্ডিয়া সিভিল পৃথকভাবে জুলাইয়ের ঘটনাবলি নিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে।
জাতীয় পুলিশের CENIF-এর ৫৫ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মরক্কোর কিছু নিরাপত্তাকর্মী অভিবাসীদের সীমান্তের দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে পথনির্দেশ দিয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও ইঙ্গিত করা হয়েছে, পুরো প্রবেশপ্রক্রিয়াটি স্পেনের সীমান্ত ব্যবস্থাকে অচল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হতে পারে।
তবে স্পেন সরকার এখনো বলছে, মরক্কো সরকার এই গণপ্রবেশের পরিকল্পনা বা বাস্তবায়নে জড়িত ছিল—এমন চূড়ান্ত প্রমাণ তাদের হাতে নেই।
অন্যদিকে, ৪ সেপ্টেম্বর গার্ডিয়া সিভিলের গোয়েন্দা শাখা আদালতে পৃথক একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সংকটের আগে পাওয়া সতর্কতাগুলো ৩০ ও ৩১ জুলাইয়ের মতো এত বড় আকারের গণপ্রবেশের পূর্বাভাস দেয়নি। ফলে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিবেদনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা দিয়েছে।
সেউতার ঘটনা নিয়ে জাতীয় আদালতের তদন্তও এগিয়ে চলছে। অডিয়েন্সিয়া ন্যাশিওনালের বিচারক মারিয়া তার্দোন পুলিশ ও গার্ডিয়া সিভিলের কাছ থেকে তথ্য চেয়েছেন।
গার্ডিয়া সিভিলের প্রতিবেদনে ৩০ ও ৩১ জুলাইয়ের ঘটনাকে ঘিরে ৮২ জনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নতুন করে পাওয়া মরদেহগুলোর সবগুলো ওই গণপ্রবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সার্বভৌমত্বের দাবি, বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ
অভিবাসন সংকটের পাশাপাশি সেউতার সার্বভৌমত্ব নিয়ে মরক্কোর বক্তব্যও পরিস্থিতিকে আরও রাজনৈতিক করে তুলেছে। ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর মরক্কো সরকারের একজন মন্ত্রী আবারও সেউতার ওপর মরক্কোর ভূখণ্ডগত দাবি বা সার্বভৌমত্বের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
অন্যদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, এখন পর্যন্ত মরক্কো সরকার এই গণপ্রবেশের সঙ্গে জড়িত—এমন ‘শক্ত প্রমাণ’ স্পেনের হাতে নেই।
ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব
অভিবাসন সংকটের প্রভাব শুধু সীমান্ত বা আশ্রয়কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে।
তাদের মতে, নিরাপত্তা, চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে সেউতার বর্তমান পরিস্থিতি এখন আর শুধু একটি অভিবাসন সংকট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগণের ক্ষোভ, স্পেন-মরক্কো সম্পর্ক, ইউরোপীয় সহায়তা এবং জাতীয় আদালতের তদন্ত।
জুলাইয়ের সেই নজিরবিহীন প্রবেশের এক মাসেরও বেশি সময় পরও সেউতা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শহরে অবস্থানরত অভিবাসীদের দ্রুত ও আইনসম্মতভাবে কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং ৩০–৩১ জুলাই আসলে কী ঘটেছিল, তার পূর্ণ সত্য কত দ্রুত সামনে আসবে।
