নিজস্ব প্রতিনিধি: পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ উদযাপন ও জসনে জুলুসকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে চলমান মতবিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। মৌলভীবাজারে প্রতিপক্ষকে প্রকাশ্য বাহাছের (খোলামেলা বিতর্ক) চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন মুফতি শেখ শিব্বির আহমদ সিরাজনগরী। অন্যদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কওমি উলামায়ে কেরামদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহার জন্য ‘মুজাকারা’র আহ্বান জানিয়েছেন মুফতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন তাহেরী।
মৌলভীবাজারে বাহাছের খোলা চ্যালেঞ্জ
মৌলভীবাজার মডেল মসজিদে মিলাদ-কিয়ামকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বহুল আলোচিত বিতর্কে মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মাসুকের দেওয়া ১০ লাখ টাকার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন মুফতি আখতারুজ্জামান ইন্দেশরী। এর পরিপ্রেক্ষিতে চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারীকে প্রকাশ্যে মাঠে এসে বিতর্কে বসার আহ্বান জানিয়েছেন মুফতি শেখ শিব্বির আহমদ সিরাজনগরী।
প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে সরকারি স্কুল মাঠে উভয় পক্ষের জন্য পৃথক দুটি মঞ্চ তৈরি করে মুখোমুখি বাহাছের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন—
«“মৌলভীবাজারের এক মুহাদ্দিস মিলাদের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। আমি উদাত্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিতে চাই—আমরা এখনো মাঠে আছি। সরকারি স্কুল মাঠে দুই দিকে দুটি স্টেজ থাকবে—একপাশে মিলাদুন্নবীর পক্ষের, অন্যপাশে বিপক্ষের। প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে আমরা বসব। দেখি তোমার হিম্মত! হিম্মত থাকলে সামনে আসো।”»
তিনি আরও দাবি করেন, নিজেদের কোনো কিতাব বা হাদিসের প্রয়োজন হবে না; বরং প্রতিপক্ষের ঘরানার বই-পুস্তক থেকেই মিলাদের বৈধতা প্রমাণ করে দেওয়া সম্ভব।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুজাকারার আহ্বান মুফতি তাহেরীর
অন্যদিকে, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ উপলক্ষে জসনে জুলুসের পদ্ধতি এবং ‘ঈদ’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কওমি উলামায়ে কেরামদের সঙ্গে মতবিরোধ নিরসনে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ‘মুজাকারা’ বা আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাংগঠনিক সচিব ও দাওয়াতে ঈমানী বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মুফতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন তাহেরী।
বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে বাহাছ বা চ্যালেঞ্জের পরিবর্তে সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে তিনি লেখেন—
«“ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কওমি উলামায়ে কেরামদের প্রতি বাহাস কিংবা চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি না। আমরা শাব্দিক অর্থের বিবেচনায় ঈদ বলে থাকি। জসনে জুলুসের পদ্ধতি নিয়ে আপনাদের দ্বিমত থাকলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে মুজাকারার জন্য বসতে প্রস্তুত আছি। আল্লাহর হাবীব ﷺ-এর শুভ আগমনে আনন্দ মিছিল করা জায়েজ—এটি যদি সাব্যস্ত করতে না পারি, জীবনে কখনো ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে জসনে জুলুস উদযাপনের নামও নেব না।”»
ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ধর্মীয় সম্প্রীতির শহর হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আলোচনার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি, পারস্পরিক মতবিরোধ আলোচনার মাধ্যমে নিরসনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
যে ঘটনাগুলো ঘিরে নতুন করে আলোচনা
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মৌলভীবাজার মডেল মসজিদকে কেন্দ্র করে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ উদযাপন এবং ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’ বলা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। একটি প্রতিবাদ সমাবেশে এক মাওলানাকে বলতে শোনা যায়, ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’ বললে তাঁর ‘কলিজায় আঘাত লাগে’। একই বক্তব্যে মসজিদের খতিবকে মিলাদ ও কিয়ামে ইয়া নবী সালামু আলাইকা বলার অপরাধে দ্রুত ইমামতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবিও তোলা হয়। এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা দেখা দেয়।
অন্যদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ উপলক্ষে আয়োজিত একটি মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে মুফতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন তাহেরীর মা সম্পর্কে মাওলানা রাকিবুল ইসলাম নামে এক বয়স্ক ব্যক্তি অশালীন ও আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
তবে পরবর্তীতে মাওলানা রাকিবুল ইসলাম মুফতি তাহেরীর বাড়িতে গিয়ে তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মুফতি তাহেরীও তাকে ক্ষমা করে দেন বলে জানা যায়।
এমন পরিস্থিতিতে একদিকে মৌলভীবাজারে প্রকাশ্য বাহাছের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুজাকারার আহ্বান—দুই ঘটনাই ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ উদযাপনকে ঘিরে চলমান মতপার্থক্য নিরসনে ভিন্ন দুটি পন্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ প্রকাশ্য বিতর্কের মাধ্যমে বিষয়টির ফয়সালা চান, আবার কেউ আলোচনার মাধ্যমে মতবিরোধের সমাধান ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
